ঢাকা শুক্রবার, ৪ঠা এপ্রিল ২০২৫, ২২শে চৈত্র ১৪৩১


স্বাধীনতা: অর্জন করে কারা, হরণ করে কারা


২৫ মার্চ ২০২৫ ১১:৩২

আপডেট:
৪ এপ্রিল ২০২৫ ০৬:০৭

ছবি: আমাদের দিন

২৬শে মার্চ আমাদের মহান স্বাধীনতা দিবস। ২৫শে মার্চ পাক-হানাদার বাহিনী কর্তৃক ইতিহাসের বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ। সেই যুদ্ধ ছিল জনমানুষের যুদ্ধ - যেই যুদ্ধের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল পাকিস্তানের দীর্ঘ তেইশ বছরের শাসনামলে। দীর্ঘ শাসনামলে পাকিস্তান সরকার একে একে বাঙালির উপর অনেক কিছু চাপিয়ে দিয়েছিল। সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতি সবদিক থেকে পূর্ব পাকিস্তান তথা বাঙালিদের কোনঠাসা করে রাখে যার ফলে বাঙালির মনে ক্ষোভ জমতে শুরু করে। ৭১ এর যুদ্ধ ছিল সেই ক্ষোভের বিস্ফোরণ। পাকিস্তান এত অত্যাচার, জুলুম, শাসন- শোষণ করলেও কতিপয় বাঙালিদের মধ্যে পাকিস্তান প্রীতি তবুও ছিল। কেন ছিল তা বুঝতে হলে আমাদের আরেকটু পেছনের ইতিহাসের দিকেও তাকাতে হবে। 

স্বাধীনতা কেন আসে আমাদের মাঝে? কেন মানুষ সামাজিক বিপ্লব করে, রাজনৈতিক আন্দোলন করে, মুক্তির জন্য জীবন দেয়? এই সমস্ত প্রশ্নের সহজ উত্তরে বলতে গেলে বলতে হয়- মানুষ স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকার চায়। কেউ তার উপর কর্তৃত্ব ফলাবে না, কোনো কিছু চাপিয়ে দিবে না। তার মত প্রকাশ করতে পারবে, সিদ্ধান্ত নিতে পারবে এসবের জন্য মানুষ স্বাধীনতা চায়। মানুষ স্বাধীনতা মানুষের কাছ থেকেই চায় এবং বারবার তা আদায় করার জন্য যুদ্ধ, সংগ্রাম করে। মানুষ ঈশ্বরের থেকে স্বাধীনতা চায় না। ঈশ্বর যদিও স্বাধীনতা দিতে পেরেছে তবে মানুষ মানুষকে স্বাধীনতা দিতে পারেনি। 

ইংরেজ শাসনামলে সাদা চামড়ার ইংরেজরা যখন দেশের কৃষক, জেলে, কামার, কুমার সম্প্রদায়ের উপর জুলুম নির্যাতন করছিল, এদেশের সম্পদ লুটপাট করে ইউরোপ পাচার করছিল তখনও এদেশের অভিজাত শ্রেণি ইংজেরদের সাহায্য সহযোগিতা করেছিল যেন ইংরেজরা এদেশে ঝামেলামুক্তভাবে শাসন শোষণ করতে পারে৷ বিনিময়ে তারা ইংরেজদের থেকে রায় বাহাদুর ও খান বাহাদুর উপাধিসহ নানান পদ পদবি পেয়েছিল। নিজেরাও বিপুল সম্পত্তির মালিক হয়ে কলকাতায় নিজেদের সেকেন্ড হোম বানিয়েছিল। ৪৭-এ দেশ ভাগের সময় পুরো বাংলা নিয়ে নতুন দেশ হয়নি, সুবিধাবাদী অভিজাত শ্রেণি বলেছিল কলকাতা আমাদের লাগবে। ফলে ধর্মের ভিত্তিতে ভারত পাকিস্তান দুটি দেশ গঠিত হয় যেখানে পূর্ব বাংলাকে পশ্চিমের পাকিস্তানের সাথে জুড়ে দিয়ে এক আজগুবি দেশ গঠন করে। যেখানে এই দুই অঞ্চলের মানুষের ধর্ম ছাড়া আর কোনো মিল ছিল না। ইংরেজদের তৈরি করে দিয়ে যাওয়া ভাগ করো শাসন করো পদ্ধতি এখনো প্রয়োগ হচ্ছে। প্রতিটা শাসক শ্রেণি তাদের শাসনকে টিকিয়ে রাখতে, জনসাধারণকে বিচ্ছিন্ন করে রাখতে উগ্রজাতীয়তাবাদ ও ধর্মকে ব্যবহার করে। এক্ষেত্রে পাকিস্তান ধর্মকে ব্যবহার করে তেইশ বছরের শাসনের ইতিহাসে বাংলার বুকে এক দুঃস্বপ্নময় অধ্যায় রচনা করে গেছে। তারা এ অঞ্চলের মানুষকেই কেবল অপমান অপদস্থ করেনি, তারা এ অঞ্চলের ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য সবকিছুকে ছোট করেছে। ধর্মের দোহাই দিয়ে শাসন করে গেছে। তাদের রাজনৈতিকভাবে সাহায্য করেছে এদেশেরই কিছু মানুষ। যারা ৭১-এর জনযুদ্ধে চায়নি পাকিস্তান ভেঙে যাক। মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয়ের মাধ্যম বাংলাদেশ নামক একক রাষ্ট্রের জন্ম হয়। একটি ভূখণ্ড ও একটি পতাকার মালিক হয় এদেশের মানুষ। ভেবেছিল এবার বুঝি স্বাধীনতা সত্যি সত্যি এলো। আমরা মুক্ত, আমরা স্বাধীন৷ আমাদের আর কেউ বাহির থেকে এসে শাসন করবে না। জুলুম করবে না। কিন্তু সেই ধারণাও বেশিদিন টিকলো না। রাজনৈতিক সরকার বেশিদিন টিকলো না। কারণ তারাও স্বৈরাচার হয়ে উঠেছিল। বাহিরের শাসক থেকে নিজেরা মুক্ত করে আবার নিজেদের লোকেদের কাছে বন্দি হলো এদেশের মানুষ। শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারকে হত্যার মধ্যে দিয়ে এদেশে সেনাশাসকের সূচনা হয় যা ১৫ বছর স্থায়ী ছিল। ৯০ দশকে আন্দোলন করে স্বৈরাচার পতন করতে হয়েছিল। এভাবেই নানান সংকট, দুঃশাসন, সাধারণ মানুষের উপর নির্যাতনের মধ্য দিয়ে চলছিল দেশ। কিন্তু সাধারণ মানুষ তার কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা কখনো পায়নি।

৪৭-এর দেশ ভাগ কিংবা ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতার কথা বললেও কোথাও স্বাধীনতা আসেনি। শুধু এক শাসক থেকে আরেক শাসকের হাতে মানুষ বন্দি হয়েছে। বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেদের একছত্রভাবে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি দাবি করে কিন্তু দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকাকালে তারা এদেশের মানুষের উপর নজিরবিহীন অত্যাচার করেছে। তাদের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুললে গুম, খুন ছিল অবধারিত। তাছাড়া ধর্ষণ, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, লুটপাট, বিদেশে অর্থপাচার সবই হয়েছে অবলীলায় তবে তা বাহিরে আসতে দেয়নি। বছর বছর কর বাড়ানো, নিত্যপণ্যের দাম বাড়ানো তো ছিল সাধারণ বিষয়। ১৫ বছরের শাসনে এমন কোনো অপরাধ নেই যা আওয়ামী লীগ করে নাই। তাদের সহযোগিতা করেছে আমলা, ব্যবসায়ী। এই আমলা, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদেরা ইউরোপ আমেরিকায় করেছে নিজেদের সেকেন্ড হোম। পাচার করেছে বিপুল সম্পত্তি। এত অন্যায় অত্যাচার করে তারাও রেহাই পায়নি৷ জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে দলবলে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। যারা নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি দাবি করতো, যারা সাধারণ মানুষের স্বাধীনতার কথা বলতো তারা ক্ষমতায় বসে হরণ করেছে মানুষের স্বাধীনতা। ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার দিনকে বলা হয়েছে বাংলাদেশের দ্বিতীয় স্বাধীনতা। কিন্তু সেই স্বাধীনতায় মানুষ কতটুকু স্বাধীন? দেশে এখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রয়েছে, এই সরকার যেহেতু কোনো রাজনৈতিক সরকার হয় ফলে এখনো মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে পারছে। আলোচনা সমালোচনা করতে পারছে কিন্তু যেই মুহূর্তে নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার আসবে তারপর এই কথা বলার স্বাধীনতা, প্রতিবাদ করার স্বাধীনতা থাকবে না। ইতিহাস তাই বলে। বুর্জোয়া ও অভিজাত শ্রেণি শাসকের আসনে বসে সাধারণ মানুষকে শাসন করতে গিয়ে তাদের সবরকম অধিকার কেড়ে নেয়। তাদের স্বাধীনতা হরণ করে। এভাবে চলতে চলতে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, স্বাধীনতা অর্জন করে কিন্তু মানুষ কখনো স্বাধীন হয় না কিংবা মানুষ ই মানুষকে স্বাধীনতা দেয় না।

 

আমির হোসেন রাজু

শিক্ষার্থী 

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।


স্বাধীনতা দিবস