ঢাকা শুক্রবার, ৪ঠা এপ্রিল ২০২৫, ২২শে চৈত্র ১৪৩১

বইমেলায় তারুণ্যের বই ও ভাবনা


২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ২৩:১২

আপডেট:
২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ০০:২৬

ছবি: আমাদের দিন

তারুণ্যের হাত ধরে এসেছে জুলাই বিপ্লবে বিজয়। এই বিজয়ের ছোঁয়া লেগেছে তাদের অন্যান্য সৃষ্টিশীলতায়। যার মধ্যে অন্যতম তাদের লেখালেখি। দারুণ উদ্দীপনা ও উৎসাহে দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীরা লিখেছেন বই। যেগুলো প্রকাশিত হয়েছে অমর একুশে বইমেলাতে। প্রতিভাবান এমন কিছু শিক্ষার্থী-লেখকের কথা জানাচ্ছেন— সিফাত রাব্বানী

 

প্রিয়ন্তি সরকার নুপুর

ইডেন কলেজ 

বই: ‘রিহানা’ 

ধরণ: উপন্যাস 

প্রকাশনী: নব সাহিত্য প্রকাশনী

স্টল নং: ৭৪৩-৭৪৪

‘পাঠক হিসেবে পরিচয় দিতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি’ 

আমি একজন আপাদমস্তক পাঠক। পড়াশোনার পাশাপাশি টুকটাক লেখালেখি করি। তবে আমি নিজেকে একজন পাঠক হিসেবে পরিচয় দিতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।  যেমন  বইয়ের পাতায় প্রতিটা গল্প ই মন দিয়ে পড়া,পড়তে পড়তে এমন ভাবে পড়ি যেন মনে হয় গল্প টা পড়ছি না যেন আমার চোখের সামনে ব্যাপারগুলো ঘটে চলছে। আমি বই পড়তে অনেক ভালোবাসি এজন্য প্রচুর পরিমাণে বই সংগ্রহ করি। অবশ্য এর জন্য বকাও কম খেতে হয়নি। অ্যাকাডেমিক বইয়ের মধ্যে আবার কাঁথাবালিশের নিচে লুকিয়ে লুকিয়ে বই পড়তাম। আর একটা কথা ই ভাবতাম কবে আমি এমন একটা বই লিখতে পারবো? আমি কি চেষ্টা করতে পারি নাহ? এমন হাজারোও প্রশ্ন মনের মধ্যে ভর করতো। তারপর একদিন নিজের মনকে শক্ত করে একমনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ই ফেললাম বই আমি লিখবোই ইনশাআল্লাহ। এরপর ২০২৪ এ অমর একুশে বইমেলায় আমার প্রথম বই ‘ইডেন কন্যা’ প্রকাশিত হয়। আলহামদুলিল্লাহ পাঠকরা বেশ সাড়া দিয়েছিলেন। সেই সাথে পরিবারপরিজন, বন্ধুবান্ধব তাদের অবদানও কম নয়।তারা পাশে ছিল এবং আছে বলেই ২০২৫ সালে ‘রিহানা’ বইটি লেখার অনুপ্রেরণা পেয়েছি। আমি নিজেকে একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে দেখতে চাই সেই সাথে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই, টাকার জন্য নয়, নিজের একটা সুন্দর পরিচয়ের জন্য। সেটা যদি লেখালেখির মাধ্যমে হয়, মন্দ নয়। বর্তমানে পড়াশোনা বা চাকরি যাই করি নাহ কেন লেখালেখি করেই যাবো, কেননা লেখালেখি আমার পেশা নয় বরং নেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

শফিক রিয়ান

ঢাকা ইন্সটিটিউট অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি

বই: ‘বিসর্জন’

ধরণ: উপন্যাস

প্রকাশনী: উপকথা প্রকাশন

স্টল নং: ৬৬৫-৬৬৬ 

‘আমি গল্পের মানুষ, গল্প বলে যেতে চাই’

মেলা নিয়ে প্রতিবারই প্রত্যাশার পারদ থাকে অনেক উপরে। মেলায় পাঠক আসবে। পাঠক-লেখকের ভিড়ে মেলায় তৈরি হবে এক আনন্দমুখর পরিবেশ। সেই লোকারণ্য ধরে হাঁটতে হাঁটতে আমি গল্প খুঁজব। পাতায় উঠাব৷ আর খুব করে চাইব, পাঠকেরা আমার বইটা ছুঁয়ে দেখুক। দু-চার পাতা পালটে দেখুক। খানিকটা যত্ন নিয়ে হাত বুলাক। আমার বিশ্বাস, এতোটুকু যথেষ্ট পাঠক আকৃষ্ট করার জন্য। বই লিখতে ও প্রকাশ করতে গিয়ে একটি ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা ছিল, যখন আমি আমার লেখা সম্পূর্ণ করার পর বুঝতে পারলাম যে, আমার ভাবনা ও ভাষার প্রকাশ এতটা গাঢ় ও ব্যক্তিগত হয়ে উঠেছে যে, এটি শুধু আমার নয়, বরং পাঠকের সঙ্গে এক ধরনের আধ্যাত্মিক সংযোগ তৈরি করতে সক্ষম। প্রথমে মনে হয়েছিল যে, লেখার মাধ্যমে শুধু একটি গল্প বা তথ্য দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু প্রকাশের পর বুঝতে পারলাম যে, পাঠকরা কীভাবে সেই লেখা নিজের জীবনের অংশ হিসেবে অনুভব করে এবং এতে তাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা, দৃষ্টিভঙ্গি বা অনুভূতির প্রতিফলন খুঁজে পায়। আমার বই ‘বিসর্জন’- মেডিকেল জীবনের অন্দরমহলের প্রতিচ্ছবি। তিন বন্ধুর স্বপ্ন, সংগ্রাম ও জীবনের গল্প। সংগ্রামের এই জুলাই বিল্পব পরবর্তী বইমেলায় তারুণ্যের আগমন বরাবরের মতই বেশি। আমিও তাদেরই মানুষ, আমি গল্পের মানুষ, গল্প বলে যেতে চাই। 

ফাউজিয়া সুলতানা স্নিগ্ধা 

গভর্নমেন্ট কলেজ অফ অ্যাপ্লাইড হিউম্যান সাইন্স

বই: ‘হিয়ার দ্য উইন্ড সিং’  

ধরণ: অনুবাদ 

প্রকাশনী: নয়া উদ্যোগ 

স্টল নং: ৫২৩-৫২৪ 

‘জুলাই বিপ্লবের শক্তি লেখালেখিতেও অনুপ্রেরণা দিয়েছে’ 

কিছু অনুভূতি, কিছু আবেগ সবসময় ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। হাজারো শব্দের বুননেও তা ফুটিয়ে তোলা সম্ভব হয় না মাঝে মাঝে। তা যেন মনের গহিন কোণের এক বাক্সে শুধু আমার হয়েই জমা থাকে। মহান আল্লাহ তায়ালার প্রতি কৃতজ্ঞতা যে তিনি আবারও আমাকে এই সুযোগ দিয়েছেন। সেটা আমি সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পেরেছি কিনা তা আমাকে জানানোর আবদার রাখলাম যারা আমার বইটা পড়বেন তাদের কাছে। জুলাই মাসেই আমার জন্ম। সেই মাসেই জন্ম নতুন এক বাংলাদেশের। ৩৬ শে জুলাই - এক নতুন বাংলাদেশ, এক নতুন উপলব্ধি, এক নতুন শুরুর প্রত্যাশা। প্রত্যাশা সবসময়ই নতুন কিছুর প্রেরণা জোগায়। যদিও মানসিক অস্থিরতার কারণে বেশ কিছুদিন লিখতে পারিনি । তবে নিয়মিত লেখালেখির মাধ্যমে আমি দেশ গঠনে ভূমিকা রাখতে চাই। জুলাই বিপ্লবের পর সবার মাঝে সঞ্চারিত নতুন এক স্বপ্নের সাথে আমিও নতুন এক উদ্যমে লেখা শুরু করতে পেরেছি। দেশ গড়তে খুব বড় কিছু হতে হয় বা খুব বড় কিছু করতে হয় তা নয়। বরং আমাদের সবার প্রচেষ্টায় ছোট ছোট ভালো কিছু কাজ আমাদের এই মাতৃভূমির জন্য অনেক বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তার প্রমাণ আমরা জুলাই বিপ্লবেই পেয়েছি। যেটা অসম্ভব, অবিশ্বাস্য বলে মনে হলেছিল, সেটাই করে দেখানো সম্ভব হয়েছে শুধু সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার কারণে। তাই সবার লক্ষ্য হোক, নিজের স্থান থেকে যেন দেশ গড়ার সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখতে পারি। তাহলেই তৈরি হতে পারে সুন্দর, স্বপ্নের এক বাংলাদেশ। 

আব্দুল মূঈদ 

স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ

বই: ‘পাতিহাঁস’  

ধরণ: উপন্যাস  

প্রকাশনী: বারোমাসি প্রকাশনী 

স্টল নং: ৭৮ 

‘প্রথম উপন্যাস লেখার অনুপ্রেরণা মা’ 

নিজের লেখা বই আকারে প্রকাশিত হবে সেটা কখনই কল্পনা করিনি আমি। বলা যায় এক প্রকার নিজের মানসিক প্রশান্তির জন্যই লিখতাম৷ তবে কবে লেখা শুরু করেছি সেটা আমার মনে নেই। ছোটবেলায় একটা ছড়া লিখে মা কে শুনিয়েছিলাম মনে পরে। সেই থেকে বোধহয় টুকটাক লিখতে শুরু করি। ২০১৬ সালের পর থেকে অডিওবুক শোনা শুরু করি। ক্রমে অডিওবুকের বাচিক অভিনয়ের প্রেমে পরে যাই। ২০১৮ থেকে নিজেই শুরু করি বাচিক অভিনয়ের কাজ। তখন থেকেই গল্প লিখতাম আর সেটাতে নিজেই কণ্ঠাভিনয় করতাম। সেই থেকে এখন অবধি লেখালেখি আর বাচিক অভিনয় নিয়েই আছি।  প্রথম উপন্যাস ‘পাতিহাঁস’ যেটা এবার প্রকাশ পেল, এটার পেছনে অনুপ্রেরণা আমার মা। করোনাকালীন সময়ে লেখা শুরু করেছিলাম। কিন্তু আগাতে পারিনি। ২৪ এর আগস্টে ব্লাকআউট এর সময় আবার লেখা শুরু করি। পাতিহাঁস উপন্যাসটি মূলত একটি প্রেমের গল্প নিয়ে তৈরি। কিন্তু পাঠক যাদের প্রেমের গল্প ভাববে আসলে তাদের প্রেমের গল্প না। একজন থ্রিলার লেখক যখন প্রেমের গল্প লিখতে যায় তখন স্বাভাবিকভাবেই কিছু না কিছু রহস্যের ছাপ থেকেই যায়। পাতিহাঁস এ আমি পাঠকের অনুভূতি নিয়ে খেলা করেছি। কখনো অনুভূতির গণ্ডি একটি জিনিসের মধ্যে আবদ্ধ হতে দেইনি। কাদিয়েছি, হাসিয়েছি, মূল্যবান আনন্দের অনুভূতি দিয়েছি এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে রাগিয়েছিও। এভাবেই আমি লিখতে চাই, শিখতে চাই আর মানুষকে গল্প শোনাতে চাই।  

মাহমুদুল হাসান রনি 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বই: ‘Into The Nights’  

ধরণ: কাব্যগ্রন্থ   

প্রকাশনী: Worthy Publication 

প্যাভি : ১৮  

‘আমি কবিতা লিখিনি, কবিতা আমাকে লিখেছে’

এইতো সেদিনের কথা; দুঃখ, কষ্ট, রাগ আর হতাশার মধ্যে পড়ে থাকা আমিটার বয়স ছিল তখন পাঁচ না হলে ছয়। আমি আমার সমস্ত অভিমানগুলো বলার মতো কাউকে পাইনি, হয়ত বলতে চাইনি। তখন থেকে লেখা শুরু করি। ছোটবেলায় নিজের শব্দগুলোও হতো ছোট ছোট, বয়স হওয়ার ধারায় কবিতাগুলোও বড় হতে থাকলো। আমাকে প্রায়শই প্রশ্ন করা হয়, আমি কবিতা কীভাবে লিখি। আমি হাসি, কেননা আমি কখনোই কবিতা লিখিনি। কবিতা আমাকে লিখেছে। মৃতপ্রায় একটা মানুষকে মৃত্যুদ্যুতের কাছে থেকে ফিরিয়ে এনেছে বারংবার। একটা কবিতা, আর সেই কবিতার সাথে মিশে থাকে আমার কতশত চুক্তিহীন অভিমান, অভিযোগ। আমি কাউকে নিজে গিয়ে বলিনি আমি কষ্ট পেয়েছি, বলতে চাইনি, বলার যোগ্যতা রাখিনি। আমি নালিশ করেছি আমার কবিতার কাছে। কবিতা ঠিক আমাকে সামলে নিয়েছে। সামলে নিয়েছে আবার অগণিত কত শতবার আমার ক্ষত হৃদয়কে আহত করেছে। অভিমান করে বলেছি, "আর লিখবো না কবিতা।" পরের দিনই হাউমাউ করে কবিতার কাছে ফিরে যেতাম। ‘Into The Nights’ বইটি একজন মৃতপ্রায় যুবকের বেছে উঠার একটা সারসংক্ষেপ। যে কথাগুলো আমি আজীবন লুকিয়ে রাখতে চেয়েছি সেগুলো লেখা এবং তা ছাপানো আমার কাছে চ্যালেঞ্জ ছিল, সেই চ্যালেঞ্জ থেকে ছাপানো এই বইটি। আপনি যখন বইটি হাতে নিবেন তখন আপনি আমার দুঃখগুলোকে হাতে নিবেন, একটু সাবধানে ধরবেন যাতে করে তা হাত থেকে পড়ে না যায়। আমি আপনাকে বইটি কিনতে বলবো না কারণ টাকা দিয়ে দুঃখ কিনতে হয়না তবে জিজ্ঞেস করবো আমার দুঃখ শোনার জন্য আপনার কাছে থেকে কি আমি একটু সময় পেতে পারি?  

আনিকা জাহীন 

মিলিটারি ইন্সটিটিউট অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি

বই: ‘ডিকোহেরেন্স’  

ধরণ: সায়েন্স ফিকশন  

প্রকাশনী: দাঁড়িকমা প্রকাশনী

স্টল নং: ৩৬৫-৩৬৬ 

‘রচনা প্রতিযোগিতায় পুরস্কৃত হওয়া বই লেখায় প্রভাবিত করেছে’ 

বই লেখার ইচ্ছা ছোটবেলা থেকেই ছিল। তবে যখন আমি রচনা প্রতিযোগিতায় পুরস্কৃত হই এবং লেখালেখিতে আরও আগ্রহী হয়ে উঠি, তখন মনে হলো এই যাত্রা আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। আমার গল্পগুলো পড়তে অন্যদের ভালো লাগবে এবং সায়েন্স ফিকশনের প্রতি আমার ভালোবাসা এই বইয়ের মাধ্যমে প্রকাশিত হতে পারে। আমার বইটি লেখার কাজ প্রায় ছয়- সাত মাস ধরে চলে। প্রথমে আমি গল্পের মৌলিক রূপ তৈরি করি, তারপর তা উন্নত করতে সময় নিয়েছি। গল্পের গভীরে যাওয়ার জন্য অনেক সময় ব্যয় হয়েছে, বিশেষত টাইম লুপের বিষয়টি সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে। ভবিষ্যতে আরও বই লিখতে চাই, বিশেষত সায়েন্স ফিকশন, ভৌতিক গল্প এবং কমেডির উপর ভিত্তি করে। আমার বই ‘ডিকোহেরেন্স’ এর দ্বিতীয় পর্ব বের করার ইচ্ছা আছে।  কারণ আমি প্রথম পর্বে টাইম লুপ এর রহস্য রেখেছি, দ্বিতীয় পর্বে এই টাইম লুপের সমাধান দেখাতে চাই। আমার ভবিষ্যতে গবেষক হিসেবে কাজ করার ইচ্ছা আছে। যেহেতু আমি বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে পড়াশোনা করছি । এই বিভাগে অনেক রিসার্চ এর সুযোগ রয়েছে। সেজন্য গবেষক হিসেবে কাজ করতে গিয়ে আরও নতুন ধারণা এবং বিষয় নিয়ে লেখার পরিকল্পনা রয়েছে। লেখালেখি আমার জন্য একটি চিরন্তন প্রক্রিয়া, যা আমি সবসময় চালিয়ে যেতে চাই। ‘ডিকোহেরেন্স’ পড়লে প্রশ্ন উঠবে এটি শুধুই বিভ্রম, নাকি একটি টাইম লুপের রহস্য? কোয়ান্টাম ডিকোহেরেন্স ডিভাইস আসলে কীভাবে কাজ করে?