ঢাকা রবিবার, ১৯শে মে ২০২৪, ৬ই জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১


টাইফয়েডের লক্ষণ কী, রোগীর পথ্য ও কিছু পরামর্শ


১৯ মার্চ ২০২১ ২১:১১

আপডেট:
১৯ মার্চ ২০২১ ২২:৪৬

টাইফয়েড জ্বর সম্বন্ধে জানে না বা এর নাম শোনেনি এমন লোক খুঁজে পাওয়া কঠিন। তবে টাইফয়েড জ্বরের ভয়াবহতা, যিনি এই রোগে আক্রান্ত হয়েছেন তিনি খুব ভালোভাবে অনুধাবন করতে পারবেন।

যেহেতু শীত পেরিয়ে আস্তে আস্তে গরম পড়া শুরু করেছে অর্থাৎ আবহাওয়া বদলাতে শুরু করেছে, আর ঠিক এই সময়ে দরজায় কড়া নাড়ে নানা রকম রোগ বালাই। এসব রোগ বালাইয়ের মধ্যে টাইফয়েড জ্বর অন্যতম।

টাইফয়েড পানিবাহিত রোগ। সালমনেলা টাইফি ও প্যারাটাইফি জীবাণু থেকে এই রোগ হয়। দূষিত পানি বা দূষিত খাবার গ্রহণের মাধ্যমে এই জীবাণু যদি মানুষের শরীরে প্রবেশ করে তবে মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়। আবার অনেক সময় টাইফয়েড রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির মাধ্যমেও এই রোগ ছড়ায়।

রোগের উপসর্গ

রোগ-জীবাণু দেহে প্রবেশের সাধারণত ১০ থেকে ১৪ দিন পর রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেতে থাকে। জ্বরই হলো এ রোগের প্রধান লক্ষণ। প্রথম চার-পাঁচ দিন জ্বর বৃদ্ধি পেতে থাকে। জ্বর কখনো বাড়ে, কখনো কমে; তবে কোনো সময় সম্পূর্ণ ছেড়ে যায় না। জ্বরের সঙ্গে মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা ও শারীরিক দুর্বলতা দেখা দেয়। কারো কারো কোষ্ঠকাঠিন্য হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে ডায়রিয়া ও বমি হয়। দ্বিতীয় সপ্তাহে রোগীর পেটে ও পিঠে গোলাপি রঙের দানা দেখা দিতে পারে। কারো কারো জ্বরের সঙ্গে কাশি হয়।


সাধারণত, টাইফয়েডের জীবাণু দেহে প্রবেশের ১০-১৪ দিন পর রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেতে থাকে।

জ্বরই এই রোগের প্রধান লক্ষণ। আক্রান্তের শরীরের তাপমাত্রা ১০৩-১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট থাকে। সঙ্গে, প্রচণ্ড মাথা ব্যথা, গলা ব্যথা, মুখের ভেতর ঘা, দুর্বলতা ডায়রিয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য বা চামড়ায় লালচে দানা দেখা দেয়া টাইফয়েডের প্রাথমিক লক্ষণ।

আর শরীরের তাপমাত্রা টানা ৩ দিনের বেশি ১০৩-১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট থাকলে দেরি না করে যত দ্রুত সম্ভব ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। মনে রাখবেন, টাইফয়েডের চিকিৎসা যদি যথাসময়ে শুরু না হয় তবে তা দেহে রক্তক্ষরণ, অগ্নাশয়ের প্রদাহ, মেরুদণ্ডে সংক্রমণ কিংবা কিডনির জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।

টাইফয়েড রোগে সুস্থতার জন্য রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার পর রোগীর অবস্থা বুঝে রোগীকে ৭-১৪ দিনের অ্যান্টিবায়টিক মেডিসিন বা ইনজেকশনের কোর্স কমপ্লিট করতে হয়। না হলে টাইফয়েডের জীবাণু সম্পূর্ণ ধ্বংস হয় না বরং পিত্তথলিতে অবস্থান নিয়ে পিত্তথলির ক্ষতিসাধন করে।

পাশাপাশি, রোগীকে সহজপাচ্য অথচ পুষ্টিকর এবং সুষম খাবার দিতে হয়, যাতে করে রোগী এই রোগের ক্ষতি দ্রুত কাটিয়ে উঠতে পারে।

যেমন খাবার খেতে হবে

টাইফয়েড রোগে আক্রান্ত রোগীর দেহে পুষ্টি উপাদানের হজম ও শোষণে ব্যাঘাত ঘটে। পাশাপাশি, রোগীর খাদ্য গ্রহণে অনীহা এবং রোগীর দেহের মেটাবলিক রেট প্রায় ১০% পর্যন্ত বেড়ে যায়। তাই, টাইফয়েড রোগীর খাদ্য নির্বাচন করতে হবে সতর্কতার সঙ্গে।

রোগীর দ্রুত আরোগ্যের জন্য রোগীকে উচ্চ ক্যালরিযুক্ত অথচ সহজপাচ্য এবং সুষম খাবার দেয়া উচিত।


দ্রুত শক্তি যোগাতে পারে এমন তরল

যেহেতু, টাইফয়েডে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের তাপমাত্রা বেশি থাকে, তাই এসময় তার ক্যালরি চাহিদাও বেড়ে যায়। এসময় ক্যালরি চাহিদা পূরণের জন্য দ্রুত শক্তি যোগাতে পারে যেমন- গ্লুকোজের পানি, ডাবের পানি, ফলের রস, লাচ্ছি- এই ধরনের খাবার বেশি করে দিতে হবে। পাশাপাশি, লেবু, আদা বা তুলসি চা-ও দেয়া যেতে পারে।

এই ধরনের স্বাস্থ্যকর পানীয় দেহে দ্রত শক্তি যোগানোর পাশাপাশি দেহের পানিশূন্যতা এবং ইলেক্ট্রোলাইটস ইমব্যাল্যান্স দূর করতে সাহায্য করে।

ফুটানো পানি টাইফয়েড মূলত পানিবাহিত রোগ। তাই পানি পানের ক্ষেত্রে নিতে হবে বাড়তি সতর্কতা। পানি খুব ভালোভাবে ফুটিয়ে জীবাণুমুক্ত করে নিতে হবে। পাশাপাশি রোগীর প্লেট, গ্লাস, চামচ ফোটানো পানি দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে। এসময়, সবচেয়ে ভালো হয় ভালো কোনো ব্রান্ডের বোতলজাত পানি পান করা।

সহজপাচ্য খাবার

টাইফয়েডে আক্রান্ত ব্যক্তিকে সহজে হজম হয়, খুব বেশি চিবোতে না হয় এবং গিলতে সুবিধা হয় এমন খাবার দিতে হবে। নরম ভাত, সিদ্ধ আলু, সফট কুকড সব্জি, পোসড ডিম, দুধ, বাচ্চা মুরগীর মাংস বা স্যুপ, সুজি, সাগু, বার্লি- এই ধরনের সহজপাচ্য খাবার রোগীকে অল্প অল্প করে বারে বারে দিতে হবে। যার ফলে, রোগীর ওজন এবং পুষ্টি উভয়ই ঠিক থাকে।

ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল

টাইফয়েডে আক্রান্ত ব্যক্তির প্রতিদিন, ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ ফল এবং ফলের জুস গ্রহণ করা উচিত। সম্ভব হলে প্রতিদিন ১-২ গ্লাস কমলা, মালটা বা আনারসের জুস গ্রহণ করতে হবে। এইসব ফলে থাকা ভিটামিন-সি ইনফেকশন, অরুচি, শরীরের প্রদাহ কমানো এবং শরীরের ইমিউনিটি বাড়াতে সাহায্য করে। তবে, ফল এবং ফল কাটার ছুরি এবং অন্যান্য জিনিস খুব ভালোভাবে বিশুদ্ধ পানি দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে।

আর হ্যাঁ, মেডিসিনের পাশাপাশি, আক্রান্ত রোগীর মাথা এবং শরীর ভালোভাবে পরিষ্কার ভেজা কাপড় দিয়ে দিনে বেশ কয়েকবার মুছে দিতে হবে। এতে করে রোগী কিছুটা হলেও ভালো অনুভব করবে। রোগীর ব্যক্তিগত পরিষ্কার-পরিছন্নতার ব্যাপারেও খেয়াল রাখতে হবে।

একইসঙ্গে, আক্রান্ত রোগীকে বাসি, পচা বা ফ্রিজের খাবার এবং পানি ও উচ্চ ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার দেয়া উচিত নয়।

আর, টাইফয়েড থেকে বাঁচতে হলে আমাদের সবাইকে রাস্তায় তৈরি যেকোনো খাবার যেমন- চটপটি, ফুসকা, শরবত পরিহার করতে হবে। সচেতন থাকুন এবং সুস্থ থাকুন।

দেখে নিতে পারেন টাইফয়েড জ্বরে ঘরোয়া সেবা দেওয়ার উপায়:

প্রচুর পানি পান: টাইফয়েড হলে যতটা সম্ভব বেশি পরিমাণে পানি খেতে হবে। অবশ্য শুধু পানি নয়, এরসঙ্গে যেকোনও তরল খাবার খেতে পারেন। ফলের রস, হার্বাল চা-ও থাকতে পারে তালিকায়। টাইফয়েড থেকে ডাইরিয়া হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে। তা যাতে না হয় তাই তরল খাবার খাওয়া প্রয়োজন। যেকোনও ফলের রস এক্ষেত্রে কার্যকরী হতে পারে। তরল যত বেশি শরীরে ঢুকবে, শরীর থেকে টক্সিন বেরিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তত বাড়বে। ফলে শরীর সুস্থ হবে তত তাড়াতাড়ি।

আদা: শরীরের যে কোনও রকম সমস্যায় আদা সবচেয়ে উপকারী। এতে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকে। এই অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট রক্তকে বিশুদ্ধ করতে সাহায্য করে। কিডনি থেকে অযাচিত পদার্থ বের করে দিতেও সাহায্য করে আদা। ফলে শরীর পরিষ্কার হয়। সবচেয়ে উপকারী কাঁচা আদা বা অর্ধেক রান্না করা আদা। এতে গুণাগুণ বেশি থাকে। তাই টাইফয়েডের সময় আদা যত শরীরে ঢুকবে, তত ভাল।

তুলসীপাতা: অনেক রোগের ওষুধ তুলসী। টাইফয়েডের জন্য এটি খুব সাধারণ ঘরোয়া ওষুধ। অনেক আয়ুর্বেদিক ওষুধ তৈরিতেও কাজে লাগে তুলসী। টাইফয়েডেও এই পথ্য যথেষ্ট উপকারী। গরম জলে প্রথমে তুলসী পাতা হালকা করে ফুটিয়ে নিতে হবে। এতে বাইরের ধুলো চলে যাবে। তারপর অল্প মধু বা আদার রস বা গোলমরিচের গুঁড়ো দিয়ে তুলসী পাতা খাওয়া যেতে পারে। টাইফয়েডের ব্যাকটেরিয়া তাড়াতে খুব সাহায্য করে তুলসী।

অ্যাপেল সিডার ভিনিগার: এতে প্রচুর অ্যাসিডিক উপাদান থাকে। জ্বর কমাতে সাহায্য করে অ্যাপেল সিডার ভিনিগার। দেহ থেকে উত্তাপ বের করে এটি। টাইফয়েড মানেই জ্বর একটি বড় সমস্যা। এক্ষেত্রে বেশি জ্বর হলে অ্যাপেল সিডার ভিনিগার দেওয়া যেতে পারে। ডাইরিয়াকেও আটকায় এই ঘরোয়া টোটকা। দেহের পুষ্টি বৃদ্ধি করতেও সাহায্য করে।

ঠান্ডা পানির জলপট্টি: জ্বর বেশি হলে ঠান্ডা পানিতে কাপড় ভিজিয়ে মাথায় দিয়ে রাখতে হবে। অর্থাৎ বেশি বেশি করে জলপট্টি দিতে হবে। দেহের তাপমাত্রা আরও বেড়ে গেলে অবশ্য এতে আর কাজ হয় না। তখন ঠান্ডা পানিতে মাথা ধুয়ে দিতে হবে। ঠান্ডা পানি দিয়ে কাপড় ভিজিয়ে সারা গা মুছিয়ে দেওয়া যেতে পারে। এতে জ্বর খুব তাড়াতাড়ি নেমে যায়।

টাইফয়েড প্রতিরোধ করা কি সম্ভব?

হ্যাঁ, স্বাস্থ্যগত সতর্কতা অবলম্বন করলে টাইফয়েড প্রতিরোধ করা সম্ভব। এর জন্য যা করণীয় তা হলো :

* সব সময় ফোটানো পানি পান করা।

* বাসি খাবার না খাওয়া।

* রাস্তার পাশ থেকে কোনো খাবার না খাওয়া।

* কাঁচা দুধ কিংবা কাঁচা ডিম কিংবা অর্ধসেদ্ধ ডিম না খাওয়া।

* হোটেল কিংবা রেস্তোরাঁয় খোলা অবস্থায় রাখা কোনো খাবার না খাওয়া।

* টাইফয়েড প্রতিষেধক টিকা গ্রহণ করা।

টাইফয়েড থেকে কী কী সমস্যা হতে পারে?

টাইফয়েডের ঠিকমতো চিকিৎসা করা না হলে নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। এমনকি রোগীর মৃত্যুও হতে পারে। রোগীর সাধারণত যে সমস্যাগুলো ঘটতে পারে তা হলো :

* ক্ষুদ্রান্ত্রে রক্তক্ষরণ কিংবা ক্ষুদ্রান্ত্র ফুটো হয়ে যাওয়া (যাকে চলতি বাংলায় আমরা নাড়ি ফুটো হওয়া বলি)।

* মেনিনজাইটিস।

* অস্থি ও অস্থিসন্ধিতে ইনফেকশন।

* পিত্তথলির প্রদাহ।

* কিডনির প্রদাহ।

* হৃৎপিণ্ডের পেশির প্রদাহ।