দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য খামারবাড়ি, সংস্কারে হাত দিয়ে বিপাকে সরকার!

কেউ পাঁচ বছর, কেউ দুই যুগ ধরে দুর্নীতির আখড়া গেড়ে বসে আছেন। সরকারি নিয়ম-নীতির কোনো তোয়াক্কা নেই তাদের কাছে। ইচ্ছেমতো অফিসে এসেছেন। জড়িয়েছেন দুর্নীতিতে। তদন্ত হয়েছে। প্রমাণিতও হয়েছে। হয়েছে শাস্তিও। কিন্তু দিনশেষে ক্ষমতার দাপটে আবারও ফিরে এসেছেন। ক্ষমতার অপব্যবহারে সুশাসন বিদায় নিয়েছিল এই দফতর থেকেই। আর এভাইে দেশের কৃষি উন্নয়নের প্রাণ কেন্দ্র রাজধানীর খামারবাড়ির কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরকে (ডিএই) দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য বানিয়েছে চিহ্নিত সিন্ডিকেট। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে অন্যান্য স্থানের মতো এখানেও সংস্কারের চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে সংস্কারে হাত দিয়ে উল্টো সিন্ডিকেটের রোষানলে পড়েছে খোদ সরকারই।
অনুসন্ধান বলছে, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে দুর্নীতিবাজ এই সিন্ডিকেট কোটি কোটি টাকা বাগিয়েছে। এখান দারোয়ানও হয়েছেন কোটি টাকার মালিক। যা দুদকের অনুসন্ধানেও উঠে এসেছে। কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বহিরাগত প্রভাবশালীর সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে ডিএই। নিয়োগ-পদোন্নতি বাণিজ্য, কমিশন বাণিজ্য, আর্থিক অনিয়মে ডুবেছে অধিদফতরটি। দুর্নীতিবাজদের দাপটে ভেঙে পড়েছে শৃঙ্খলা। উৎকণ্ঠায় সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক কার্যক্রমও।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য বলছে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই সিন্ডিকেটের অনেক সদস্যই আত্মগোপনে চলে যান। তবে সম্প্রতি কৌশলী ভূমিকায় ছাত্র আন্দোলনের নেতা পরিচয়ে তারা এখন সামনে আসতে শুরু করেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, অর্থের বিনিময়ে কিছু শিক্ষার্থীকে দিয়ে সংস্কারে হাত দেওয়া কর্মকর্তাদের নাজেহালের ছক আঁকছেন। এ নিয়ে খামারবাড়িতে উত্তেজনা চলছে। ঘটেছে মারামারির ঘটনাও। সড়ক অবরোধ করে সরকারকে চাপে ফেলতেও মরিয়া ছিল এই চক্র। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সেনাবাহিনীর তৎপরতায় তা ব্যর্থ হয়।
সরশেষ গত ১৬ মার্চ একদল যুবক-যুবতী শিক্ষার্থী পরিচয়ে খামারবাড়ি ঘেরাও করে। তারা খামারবাড়ির সামনের রাস্তা অবরোধ করে। এসময় তারা ফ্যাসিস্ট আখ্যা দিয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. ছাইফুল আলমের পদত্যাগ দাবি করেন। অথচ সরকার সংস্কারের উদ্দেশ্যেই তাকে এখানে নিযুক্ত করেছে।
আন্দোলন চলাকালীন এই শিক্ষার্থীদের কাছে মহাপরিচালকের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তারা সেটি এড়িয়ে যান। পরবর্তী সময়ে পুলিশ ও সেনাবাহিনী লাঠিচার্জ করে তাদের সরিয়ে দেয়। এছাড়া খামারবাড়ি এলাকায় সেনাবাহিনী, পুলিশসহ গোয়েন্দা তৎপরতাও বাড়ানো হয়।
এর আগে, ডিএইর প্রশাসন ও অর্থ উইংয়ের উপ-পরিচালক ড. মুহাম্মদ মাহবুবুর রশীদকে মেহেরপুরের বারাদি হর্টিকালচার সেন্টারে উপ-পরিচালক পদে বদলির প্রজ্ঞাপন জারি করে কৃষি মন্ত্রণালয়। গত বৃহস্পতিবার মাহবুবুর রশীদের স্থলাভিষিক্ত করা হয় উদ্ভিদ সংগনিরোধ উইংয়ের উপ-পরিচলক (আমদানি) মো. মুরাদুল হাসানকে। বদলির প্রজ্ঞাপন জারির পরপরই ১৪ মার্চ গেটে তালা ঝুলিয়ে কিছু কর্মকর্তা বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত মো. মুরাদুল হাসানের ২০৭ নম্বর কক্ষে প্রবেশ করে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। বিসিএস (কৃষি) অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য সচিব এবং ডিএই এর হবিগঞ্জের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (উদ্ভিদ সংরক্ষণ) মো. রেজাউল ইসলাম মুকুল, উদ্ভিদ সংগনিরোধ উইংয়ের উপ-পরিচালক (রফতানি) হাসান ইমাম, উপ-পরিচালক (লিগ্যাল ও সাপোর্ট সার্ভিসেস) এ কে এম হাসিবুল হাসান, অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (প্রশাসন-১) নাজিউর রোউফ খান বনি, অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (প্রশাসন-২) মাসুম, মৌলভীবাজারের বীজ প্রত্যয়ন অফিসার গোলাম মোস্তফা শিমুলসহ আরও কয়েকজন উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় করেন। মাহবুবুর রশীদের বদলি বাতিল না হলে তারা খামাবাড়ি অচল করে দেওয়ারও হুঁশিয়ারি দেন।
বিক্ষুব্ধ কর্মকর্তাদের দাবি ছিল, ড. মুহাম্মদ মাহবুবুর রশীদ মাহবুবুর রশীদ বিএনপিন্থী হওয়ার কারণে আওয়ামী লীগের আমলে বঞ্চিত ছিলেন। ৫ আগস্টের পর বঞ্চিত এই কর্মকর্তাকে প্রশাসন উইংয়ে পদায়ন করা হয়। কিন্তু এখন কোনো অভিযোগ ছাড়াই তাকে বদলি করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত তারা মেনে নেবেন না। একারণেই খামারবাড়িতে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
প্রশাসন ও অর্থ উইংয়ের পরিচালক মো. হাবিবউল্লাহ্ জানান, ঘটনার সময় তিনি মন্ত্রণালয়ে ছিলেন। বিকেলে খামারবাড়িতে এসে দেখেন মূল গেটে তালা ঝুঁলছে। তখন তিনি বিক্ষুব্ধদের সঙ্গে কথা বলে তালা খোলার ব্যবস্থা করেন। ভেতরে গিয়ে দেখতে পান কিছু কর্মকর্তা বেশ ক্ষুব্ধ আচরণ করছেন। সরকারি চাকরিতে বদলি-পদায়ন স্বাভাবিক নিয়ম। সুতরাং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা যেন না ঘটে সে বিষয়ে সর্তক করা হয়েছে।
অস্থিরতার মূলে কী এবং কে?
অনুসন্ধান বলছে, ৫ আগস্ট বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই অভ্যন্তরীণ তদন্ত ও মূল্যায়ন কার্যক্রম শুরু হয়। সেখানে এই দুর্নীতিবাজ চক্রের অপতৎপরতা ভাঙতে সরকার বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেয়। এর অন্যতম হলো বদলি। আর এতেই চটেছে এই চক্রটি।
জানা গেছে, চলতি মাসের ১৩ তারিখ উপ-পরিচালক ড. মুহাম্মদ মাহবুবুর রশীদকে বদলির আদেশকে ইস্যু করে এই চক্রটি আবারও সরব হয়ে ওঠে। তদবিরে ব্যর্থ হয়ে ভিন্নপথে হাঁটা শুরু করেছে। যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত ও শাস্তিপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ডিএই হবিগঞ্জের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (উদ্ভিদ সংরক্ষণ) মো. রেজাউল ইসলাম মুকুল। অর্থ খরচ করে বহিরাগতদের দিয়ে খামারবাড়ি অচল করে দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য, সরকারি আদেশ ও প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, রেজাউল ইসলাম মুকুল ২০০১ সালে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। ২০০৭ সালে তিনি বরিশাল, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি ও বরগুনা স্মলহোল্ডার সাপোর্ট প্রকল্পের সহকারী পরিচালক ছিলেন। ২০১০ সালে ছিলেন বৃহত্তর বরিশাল ও খুলনা অঞ্চলের লবণাক্ত পতিত জমিতে সম্প্রসারণ কর্মসূচির পরিচালক। এ সময়ে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে তাকে বরখাস্ত করা হয়।
২০১৩ সালের ৩ ডিসেম্বর কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকাকালে রেজাউল ইসলামকে (পরিচিতি নং-১৯৭৭) সাময়িকভাবে বরখাস্ত করে কৃষি মন্ত্রণালয়। চোরাই মালামাল ক্রয়-বিক্রয়ের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ গ্রেফতার করলে সরকারি কর্মচারী (শৃংখলা ও আপিল) বিধিমালা, ১৯৮৫ এর বিধি ১১ (১) এবং বিএসআর পার্ট-১ এর ৭৩ নং বিধির নোট-২ অনুসারে গ্রেফতারের পর ২৬ নভেম্বর ২০১৩ থেকে তাকে সরকারি চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এরপর ২০১৪ সালের ১৬ মার্চ তার বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষের বিনা অনুমতিতে কর্মস্থলের বাইরে অবস্থান এবং চোরাই মালামাল ক্রয় বিক্রয়ের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ১৯৮৫ এর বিধি ৩ (বি) অনুযায়ী ‘অসদাচরণ’ এর অভিযোগে বিভাগীয় মামলা (মামলা নং-০২/২০১৪) করা হয়।
বিভাগীয় মামলা তদন্তের জন্য মন্ত্রণালয়ে তৎকালীন উপ-সচিব সনৎ কুমার সাহাকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। তদন্ত কর্মকর্তার দাখিলকৃত তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় বিধিমালার ৪(৩) (সি) অনুযায়ী কেন তাকে চাকরি থেকে অপসারণের দণ্ড প্রদান করা হবে না এ মর্মে দ্বিতীয়বার কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করা হয়। জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ১৯৮৫’র ৭(৭) অনুযায়ী ‘অসদাচরণ’ এর অভিযোগে তাকে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়।
কিন্তু প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের ক্ষমতার বলে কয়েক বছর পর চাকরিতে যোগ দিয়ে উপ-প্রকল্প পরিচালক পদ বাগিয়ে নেন তিনি। এবার পদকে কাজে লাগিয়ে ঠিকাদারি ব্যবসায় নামেন তিনি। দুর্নীতির নানা অভিযোগে প্রকল্পের মাঝপথেই তাকে আবারও অপসারণ করা হয়। স্ব-পদে বহাল থাকতে শুরু করেন তদবির। যদিও কৃষি মন্ত্রণালয়ের চাপে শেষ রক্ষা হয়নি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২১ সালের জুনে ১৫৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘কেন্দ্রীয় প্যাকিং হাউসে স্থাপিত উদ্ভিদ সংগনিরোধ ল্যাবরেটরিকে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ল্যাবরেটরিতে রূপান্তর’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১ কোটি ৭৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘উন্নতমানের কনফারেন্স ও ট্রেনিং রুম’ সংস্কার কাজে তার ২৫ লাখ টাকা কমিশন বাণিজ্যের তথ্য ফাঁস হয়ে যায়।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাল্টিবিজ ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী ইকবাল হোসেন জানান, মাল্টিবিজ ইন্টারন্যাশনালের লাইসেন্স ব্যবহার করে শিহাব সজল নামে এক ব্যক্তিকে দিয়ে ৪০ শতাংশ কাজ রেজাউল ইসলাম মুকুল করেছেন। শিহাব সজল নামে কারও সঙ্গে তাদের যোগাযোগ নেই। এ কাজের বিল মাল্টিবিজ পরিশোধ করেছে রেজাউল করিম মুকুলকে। এছাড়া কেমিক্যাল সরবরাহসহ আরও বেশ কয়েকটি কাজ অন্যের লাইসেন্স ব্যবহার করে রেজাউল করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
চাকরিবিধি লঙ্ঘন করে মুকুলের দাম্ভিকতা!
গত ১৫ মার্চ বিসিএস কৃষি অ্যাসোসিয়েশনের ব্যানারে সংবাদ সম্মলেন করেছেন রেজাউল ইসলাম মুকুল। নিজেকে এই সংগঠনের সদস্য সচিব হিসেবে পরিচয় দেন। যদিও সেই সংবাদ সম্মেলনে আর কোনো পদধারী ছিলেন না। সংবাদ সম্মেলনে প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালকসহ সরকারের বিরুদ্ধেও বিষোদগার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, সরকারি চাকরির বিধিমালা ১৯৭৯ অনুযায়ী, সরকারি কর্মকর্তাদের নির্দিষ্ট কিছু বিধিনিষেধের মধ্যে থাকতে হয়। বিধি ৫ অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মকর্তা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়াতে বা জনসমক্ষে রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে পারেন না। অথচ সংবাদ সম্মেলনে ডিজিকে অপসারণের দাবিসহ সরকারের বিষাদগার করেন। যা বিধি পরিপন্থী। এছাড়া বিধি ২১ অনুযায়ী, সরকারি কর্মকর্তারা অনুমতি ছাড়া গণমাধ্যমে প্রশাসনিক বিষয়ে বক্তব্য দিতে পারেন না। কিন্তু এই সংবাদ সম্মেলনে তারা কোনো ধরনের অনুমতি না নিয়ে সরাসরি মিডিয়াতে বক্তব্য দিয়েছেন, যা চাকরির শৃঙ্খলার লঙ্ঘন।
তথ্য বলছে, আওয়ামী লীগ আমলে দাপট দেখানো কর্মকর্তারা এখন নিজেদের বিএনপিপন্থী হিসেবে দাবি করছেন। অথচ বিএনপিপন্থী কৃষিবিদদের সংগঠনের কমিটি অনেক আগেই বিলুপ্ত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেজাউল ইসলাম মুকুল বলেন, ‘একটি চক্র আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।’ চাকরি থেকে বরখাস্ত ও মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়েছিল। মামলা মীমাংসা হয়েছে।’
এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহা-পরিচালক মো. ছাইফুল আলম বলেন, ‘খামারবাড়ি চত্ত্বরে শৃঙ্খলাবিরোধী কোনো কার্যক্রম করা যাবে না। যারা করছেন, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’