ঢাকা শুক্রবার, ১৯শে এপ্রিল ২০২৪, ৭ই বৈশাখ ১৪৩১


অভিযোগ প্রমাণিত, তবু চাকরিতে বহাল-পদোন্নতি!


২ মার্চ ২০২১ ১৮:৩৩

আপডেট:
২ মার্চ ২০২১ ১৮:৪২

প্রায় ১০ বছর, সুনির্দিষ্টভাবে বললে ৯ বছর ৮ মাস ২২ দিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন।  কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার পর বিভাগীয় মামলা হয়েছিল গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রকৌশলী মো. মইনুল ইসলামের বিরুদ্ধে। মামলায় অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় বাংলাদেশ সরকারি কর্ম-কমিশনের (বিপিএসসি) মতামত নিয়ে প্রায় সাত বছর আগে তাকে চাকরিচ্যুতও করে মন্ত্রণালয়। তবে বিতর্কিত এ প্রকৌশলী এখন গণপূর্ত অধিদপ্তরের  অধিদফতরের (খুলনা জোন) অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী।

প্রকৌশলী কীভাবে ফের চাকরি ফিরে পেলেন এবং পদোন্নতি পেলেন তা নিয়ে ছিল নানা ধরনের প্রশ্ন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের তৎকালীন শীর্ষ কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ করে’ আজকের এ অবস্থানে এসেছেন মইনুল; যার বিরুদ্ধে যুবলীগ নামধারী বিতর্কিত ঠিকাদার গোলাম কিবরিয়া ওরফে জি কে শামীমের কোম্পানিকে র‌্যাব সদর দপ্তরের প্রায় ৪৫০ কোটি টাকার কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগও আছে।

যে তথ্য তিনি নিজে দিয়েছেন : গণপূর্ত অধিদপ্তরে জমা দেওয়া তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, প্রকৌশলী মইনুল ইসলাম চাকরি জীবনের শুরু থেকে শৃঙ্খলা ভঙ্গ করতে শুরু করেন। বিসিএস (গণপূর্ত) ১৫তম ব্যাচের প্রায় সবাই সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে ১৯৯৫ সালের ১৫ নভেম্বর যোগদান করলেও তিনি ১৯৯৬ সালের ১২ আগস্ট যোগ দেন। এরপর কয়েক বছর সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে চাকরি করে ১৯৯৯ সালের ৯ আগস্ট থেকে ২০০১ সালের ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত উপবিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে প্রধান দপ্তরে সংযুক্ত ছিলেন। ২০০২ সালের ১৩ জুলাই থেকে ২০০৫ সালের ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন প্রজেক্ট ডিভিশন-৩ ও শেরেবাংলা উপবিভাগ-৫-এ। একই পদে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে ২০০৮ সালের ২৮ ডিসেম্বর থেকে ২০১২ সালের ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত কর্মরত দেখিয়েছেন তিনি। তবে ২০০৫ সালের ১৫ জানুয়ারি থেকে ২০০৮ সালের ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩ বছর ১১ মাস ১৩ দিন চাকরির কোনো তথ্য দিতে পারেননি তিনি। ২০০৮ সালের ২৮ ডিসেম্বর থেকে ২০১৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৫ বছর ৮ মাস ২২ দিন তিনি রিজার্ভ (সংযুক্ত) ছিলেন বলে উল্লেখ্য করেছেন। এ হিসাবে তিনি নিজে ২০০৫ সালের ১৫ জানুয়ারি থেকে ২০১৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ বছর ৮ মাস ২২ দিন চাকরিতে অনিয়মিত ও রিজার্ভ থাকার বিষয়টি তুলে ধরেছেন।

যেভাবে চাকরিচ্যুত হলেন : মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মইনুল ইসলামকে (রিজার্ভ) ২০০৯ সালের ১০ অক্টোবর (স্মারক নং-সশা-১/১প-৩/০৯/১৬৮) প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ভোলার নির্বাহী প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্ব দিয়ে পদায়ন করা হয়। তিনি পদায়ন করা কর্মস্থলে যোগদান না করে একই বছরের ২৬ অক্টোবর ১ মাস ১৫ দিনের ছুটির আবেদন করে বিনা অনুমতিতে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন। এজন্য কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তত্ত্ব¡াবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন) ২০১০ সালের ১৮ জানুয়ারি কারণ দর্শানোর নোটিস দেন। এরপরও তিনি নোটিসের জবাব না দিয়ে ২০১২ সালের ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত যোগদান করেনি। এ অবস্থায় বিনা অনুমতিতে দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার কারণে এ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ১৯৮৫ এর ৩ (বি) ও ৩ (সি) উপ-বিধি অনুযায়ী অসদাচরণ ও বিনা অনুমতিতে কর্মস্থল ত্যাগের (ডিজারশন) অভিযোগে মামলা করা হয়। এ অভিযোগের পর আত্মপক্ষ সমর্থনে এ প্রকৌশলীকে লিখিত জবাব ও ব্যক্তিগত শুনানির জন্য বলা হলে তিনি কোনো সাড়া দেননি। পরবর্তী সময়ে বিভাগীয় মামলাটি তদন্ত করার জন্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মামুনুর রশিদ খলিলিকে নিয়োগ করা হয়। তদন্ত শেষে তিনি জানান, তার তদন্তকালে মইনুল ইসলাম উপস্থিত হননি। উপস্থিত না হওয়ার কারণও জানাননি। তাই তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এরপর মইনুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিনা অনুমতিতে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার কারণে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ১৯৮৫ এর ৩ (বি) ও ৩ (সি) উপ-বিধি অনুযায়ী তাকে চাকরি হতে অপসারণের সিদ্ধান্ত হয়।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, মইনুল ইসলামকে চাকরি থেকে অপসারণ করতে ২০১২ সালের ২০ ডিসেম্বর পূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (প্রশাসন-৫) মো. হেমায়েত হোসেন স্বাক্ষরিত একটি চিঠি পিএসসির সচিবের কাছে পাঠানো হয়। সেখানে বলা হয়, এ প্রকৌশলীকে চাকরি থেকে অপসারণ করতে হলে বাংলাদেশ কর্ম-কমিশন প্রবিধানমালা, ১৯৭৯ এর ৬ ধারা অনুযায়ী কমিশনের মতামত প্রয়োজন। এ চিঠির পর ২০১৩ সালের ২২ জানুয়ারি পিএসসির তৎকালীন সচিব চৌধুরী মো. বাবুল হাসান স্বাক্ষরিত পত্রে গণপূর্ত সচিবকে মতামত পাঠান। এতে বলা হয়, ‘কাগজপত্রাদি পরীক্ষা-নিরীক্ষান্তে মইনুল ইসলামের বিরুদ্ধে অসদাচরণ ও ডিজারশনের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় বিধি অনুযায়ী চাকরি থেকে অপসারণের কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের সঙ্গে কমিশন একমত পোষণ করেছে। এ সুপারিশের ভিত্তিতে গৃহীত ব্যবস্থা সম্পর্কে কমিশনকে অবহিত করার জন্য বলা হলো।’ এর কিছুদিনের মধ্যেই তাকে অপসারণ করে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক প্রকৌশলী  জানান, মইনুল ইসলাম মূলত চাকরির শুরুতেই উদাসীন ছিলেন। কয়েক বছর চাকরি করে বিনা অনুমতিতে অস্ট্রেলিয়া গিয়ে উচ্চ বেতনে চাকরি নেন। বিদেশ যাওয়ার সময় অনেকের কাছে মইনুল ইসলাম বলেন, এ (গণপূর্ত) চাকরিতে আর ফিরবেন না। দীর্ঘদিন অনুপস্থিতির কারণে তার চাকরি চলে যায়। কিন্তু ছয়-সাত বছর পর দেশে ফিরে আবার মনস্থির করেন চাকরিতে ফিরবেন। এরপর অনেকটা অসম্ভবকে সম্ভব করে তিনি চাকরিতে ফেরেন।

যেভাবে চাকরি ফিরে পেলেন : চাকরি হারানোর পর প্রকৌশলী মইনুল ইসলামের পক্ষ থেকে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর কাছে একটি আবেদন করা হয়। সেখানে তিনি চাকরি ফিরে পেতে মানবিক দিকসহ নানা বিষয় বিবেচনা করার কথা বলেন। এরপর গণপূর্তের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. কবির আহমেদ ভূঁইয়া গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিবের কাছে একটি চিঠি লেখেন। সেখানে তিনি প্রকৌশলী মইনুল ইসলাম দীর্ঘ সময় অসুস্থ ছিলেন এবং আরও বেশকিছু সময় দেশের বাইরে অবস্থান করার কথা উল্লেখ করেন। তাই এ প্রকৌশলীর বিষয়টি সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করার অনুরোধ জানান। এরপর এ বিষয়ে মতামত নিতে ২০১৪ সালের ১১ মে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন যুগ্ম সচিব তন্দ্র শিকদার পিএসসির সচিবের কাছে চিঠি দেন। এ চিঠি পেয়ে পিএসসির তৎকালীন সচিব একেএম আমির হোসেন একই বছরের ২৩ জুন গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিবকে লিখিত চিঠির মাধ্যমে বলেন, ‘মইনুল ইসলামকে চাকরি থেকে অপসারণে বিধিগত পদ্ধতি সঠিক ছিল। প্রকৌশলী মইনুল ইসলামকে পুনর্বহালের উদ্দেশ্যে তার বিষয়ে পুনরায় কমিশনের মতামত চাওয়া হয়েছে। বিধিগতভাবে চাকরি পুনর্বহালের সুযোগ নেই মর্মে কমিশন অভিমত ব্যক্ত করেছে।’ এ চিঠি পাওয়ার পর ২০১৪ সালের আগস্টের ১৯ তারিখ তৎকালীন গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিব মো. গোলাম রব্বানী একটি অফিস আদেশ জারি করে প্রকৌশলী মইনুল ইসলামকে চাকরিতে পুনর্বহাল করেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পিএসসির সাবেক সদস্য অধ্যাপক ড. শরীফ এনামুল কবির  বলেন, ‘বিধি অনুযায়ী অপসারণের জন্য কমিশনের মতামত নিতে হয়। আবার চাকরিতে বহাল করার ক্ষেত্রেও কমিশনের মতামত নিতে হয়। কমিশন যেখানে পুনরায় চাকরিতে বহাল করার সুযোগ নেই বলে মতামত দিয়েছে সেটি আমলে না নিয়ে কোনো অফিস আদেশ করা হলে তা বৈধ হবে না।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিব মো. গোলাম রব্বানী  বলেন, ‘বেশ কয়েক বছর আগের কথা এটি। যা কাজ করা হয়েছে তা নিচ থেকে ওপর পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে ফাইল এসেছে, সেই অনুযায়ী করা হয়েছে। আর যে চিঠিটি জারি করা হয়েছে তা ব্যক্তি গোলাম রব্বানী হিসেবে করিনি; তা করেছি মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে।’

জি কে শামীমকে কাজ দিয়ে বিতর্কে জড়ান : যুবলীগ নামধারী বিতর্কিত ঠিকাদার গোলাম কিবরিয়া ওরফে জি কে শামীমের কোম্পানির নামে পাওয়া র‌্যাব সদর দপ্তরের প্রায় ৪৫০ কোটি টাকার প্রকল্পের দরপত্র আহ্বানেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নিয়ম অনুযায়ী এ দরপত্রটি ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-৩ থেকে আহ্বানের কথা ছিল। কিন্তু এটি গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মইনুল ইসলামের দপ্তর থেকে করা হয় এবং তিনি ছিলেন দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির প্রধান। এ কাজে জি কে শামীমকে ৬ দশমিক শূন্য ৯ ভাগ ঊর্ধ্ব দরে কাজ দেওয়া হয়। এ হিসাবে সরকারের নির্ধারিত দরের চেয়ে প্রায় ৭৫ কোটি টাকা বেশি দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিব মো. শহীদ উল্লা খন্দকার কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. সাহাদাত হোসেনও কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ দুদকে

এদিকে, বিতর্কিত ঠিকাদার জি কে শামীমকে র‌্যাব সদর দফতরের সাড়ে চারশ কোটি টাকার কাজ পাইয়ে দেওয়ার পেছনে প্রকৌশলী মঈনুল কলকাঠি নেড়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন প্রকল্পে ‘পছন্দের’ ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিতে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। আর এর মাধ্যমেই তিনি বিপুল পরিমাণ সম্পদ গড়েছেন।

দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জাহাঙ্গীর আলম নামে একজন ঠিকাদার খুলনা গণপূর্ত বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ড. মঈনুল ইসলামের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন। দুদকের ওই অভিযোগে বলা হয়েছে, ড. মঈনুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। দুর্নীতি করে নামে-বেনামে গড়েছেন অবৈধ সম্পদের পাহাড়।

অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুদক মঈনুলের অবৈধ সম্পদ অর্জনসহ অন্যান্য দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে তদন্তও শুরু করে। ২০২০ সালের শুরুর দিকে তাকে দুদকে তলব করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সম্পদের বিবরণী চাওয়া হয়। দুদকের সেই তদ্ন্ত এখনো চলছে।

এসব অভিয়োগ নিয়ে জানতে চাইলে গণপূর্ত অধিদফতরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (খুলনা জোন) ড. মঈনুল ইসলামকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। তার মোবাইলে এসএমএস পাঠিয়েও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে  বলেন, ২০১৪ সালে আমি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলাম না। তারপরও বিষয়টি আমি জেনেছি। আপনার কাছ থেকেও আরও বিস্তারিত জানলাম। বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে খতিয়ে দেখা হবে এবং তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।