ঢাকা সোমবার, ১১ই মে ২০২৬, ২৯শে বৈশাখ ১৪৩৩


তদন্তে বেরিয়ে এল হামে ৪১৫ প্রাণহানির নেপথ্য কারণ

ইউনূস সরকারের আমলে টিকা মজুত থাকলেও কেন পেল না শিশুরা


প্রকাশিত:
১১ মে ২০২৬ ১৮:২১

দেশে হামের প্রাদুর্ভাব এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ইতোমধ্যে ৫৬টি জেলায় ছড়িয়ে পড়া এই সংক্রমণে প্রাণ হারিয়েছে ৪১৫ জন শিশু। অথচ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মৃত্যুর মিছিল ঠেকানো সম্ভব ছিল। কারণ, সরকারের গুদামে পর্যাপ্ত টিকা মজুত থাকলেও সময়মতো টিকাদান ক্যাম্পেইন না হওয়া এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের লাগাতার কর্মবিরতির কারণে এই মানবিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে। এই বিপুল সংখ্যক শিশুর মৃত্যুর পেছনে কারও অবহেলা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) সূত্রে জানা গেছে, হামের (এমআর) টিকার কোনো সংকট দেশে ছিল না। এমনকি বর্তমান ক্যাম্পেইনের জন্য প্রয়োজনীয় টিকা গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসেই কেন্দ্রীয় গুদামে এসে পৌঁছায়। কিন্তু সেই টিকা মাঠপর্যায়ে শিশুদের দেওয়ার উদ্যোগ বারবার পিছিয়ে যায়। এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে—পূর্বঘোষিত টাইফয়েড ক্যাম্পেইন, স্বাস্থ্য সহকারীদের আন্দোলন এবং জাতীয় নির্বাচন। ফলে মজুত থাকা সত্ত্বেও জীবনরক্ষাকারী এই টিকা শিশুদের শরীরে পৌঁছাতে মাসখানেক বিলম্ব হয়।

২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে দেশের টিকাদান কর্মসূচিতে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটে। বেতন বৈষম্য ও পদোন্নতিসহ ৬ দফা দাবিতে বাংলাদেশ হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাসোসিয়েশন দেশব্যাপী প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার অস্থায়ী কেন্দ্রে টিকাদান বন্ধ করে দেয়। এই আন্দোলনের ফলে ডিসেম্বরে এমআর-১ টিকার কভারেজ যেখানে প্রায় ৯৮ শতাংশ থাকার কথা, সেখানে তা নেমে আসে মাত্র ২৭ শতাংশে।

এসোসিয়েশনের প্রধান সমন্বয়কারী মো. ওয়াসি উদ্দিন রানা স্বীকার করেন যে, দাবি আদায়ের লক্ষ্যে তারা ডিসেম্বর মাসজুড়ে টিকাদান বন্ধ রেখেছিলেন। ইপিআইয়ের তৎকালীন উপ-পরিচালক শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেন, “স্বাস্থ্য সহকারীদের আন্দোলনের সময় মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়েছিল, যা টিকার ক্ষেত্রে একটি বড় গ্যাপ বা শূন্যতা তৈরি করে।”

হামে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুর হার বাড়ার পেছনে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুলের অভাবকেও দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। গত এক বছর ধরে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকায় শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেছে। রোগতত্ত্ববিদরা বলছেন, ভিটামিন ‘এ’র ঘাটতি থাকায় আক্রান্ত শিশুরা দ্রুত নিউমোনিয়া ও অপুষ্টিতে আক্রান্ত হচ্ছে, যা মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করছে।

জনস্বাস্থ্য ও টিকা বিশেষজ্ঞ ড. তাজুল ইসলাম বারী বলেন, “সর্বশেষ ২০২১ সালের জানুয়ারিতে বড় কোনো ক্যাম্পেইন হয়েছিল। এরপর ৫ বছরের একটি দীর্ঘ বিরতি এবং এর মধ্যে স্বাস্থ্যকর্মীদের আন্দোলনে নিয়মিত টিকা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় একটি ‘আউটব্রেক’ বা প্রাদুর্ভাব তৈরি হয়। গত সেপ্টেম্বরে যদি টিকা আসার সাথে সাথে ক্যাম্পেইন করা যেত, তবে ৪১৫টি প্রাণ হয়তো আজ বেঁচে থাকত।”

পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৯ সালে যেখানে হামের টিকার দ্বিতীয় ডোজের কভারেজ ছিল ৮৯ শতাংশ, ২০২৩ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৮০.৭ শতাংশে। এর ফলে প্রায় দুই কোটি শিশু সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকিতে পড়ে যায়। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার গত ২০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী জরুরি ক্যাম্পেইন শুরু করলেও তার আগেই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, “আমরা আইইডিসিআর-কে বিষয়টি নিয়ে গবেষণার দায়িত্ব দিয়েছি। কেন নিয়মিত টিকার বাইরে এত বিপুল সংখ্যক শিশু থেকে গেল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আশা করছি দ্রুতই আমরা এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারব।”

তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রশাসনিক গাফিলতি এবং জনস্বাস্থ্য কর্মসূচিকে আন্দোলনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের চড়া মাশুল দিতে হলো দেশের শত শত অসহায় শিশুকে।