স্বপ্ন হয়ে গিয়ে ফিরলেন লাশ হয়ে: আদরের বৃষ্টির শেষ বিদায়ে বুকফাটা আর্তনাদে কাঁপছে চর গোবিন্দপুর
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার মেধাবী বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির (২৬) মরদেহ এখন তাঁর পৈতৃক ভিটার পথে। নিথর দেহ হয়ে ফেরার এই সংবাদে মাদারীপুর সদর উপজেলার খোয়াজপুর ইউনিয়নের চর গোবিন্দপুর গ্রামে বইছে শোকের মাতম। যে মেয়েটি বিশ্বজয়ের স্বপ্ন নিয়ে দেশ ছেড়েছিলেন, আজ তাঁর ফেরার অপেক্ষায় শোকাতুর স্বজন ও এলাকাবাসীর কান্নায় ভারি হয়ে উঠেছে আকাশ-বাতাস।
শনিবার (৯ মে) সকাল থেকেই বৃষ্টির বাড়িতে ভিড় করতে শুরু করেছেন দূর-দূরান্ত থেকে আসা বন্ধু-বান্ধব ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। বাড়ির আঙিনায় চলছে তাঁর চিরনিদ্রায় শায়িত হওয়ার স্থান—কবর খোঁড়ার কাজ। সবার চোখে জল, আর মনে কেবল একটিই প্রশ্ন—কেন এভাবে অকালে ঝরে গেল মেধার এই উজ্জ্বল নক্ষত্র?
স্বজনরা জানান, শনিবার সকাল ৮টা ৪০ মিনিটের দিকে বৃষ্টির মরদেহ বহনকারী বিমানটি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিমানবন্দরের যাবতীয় প্রক্রিয়া শেষে বেলা ১১টার দিকে মরদেহ নিয়ে একটি অ্যাম্বুলেন্স মাদারীপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, দুপুর ৩টার মধ্যে মরদেহটি তাঁর নিজ গ্রামে পৌঁছাবে।
গ্রামের প্রতিটি ঘরে আজ বিষাদের ছায়া। এলাকাবাসী জানান, বৃষ্টি শুধু একজন শিক্ষার্থীই ছিলেন না, তিনি ছিলেন পুরো চরাঞ্চলের গর্ব। নিহতের চাচি জাকিয়া সুলতানা বিলাপ করতে করতে বলেন, ‘বৃষ্টি ছিল আমাদের এলাকার একটি শিক্ষার আলো। সেই আলোটা এভাবে নিভে যাবে কখনোই ভাবতে পারিনি। তাঁর কাছ থেকে আমার ছেলেমেয়েরা অনেক কিছু শিখেছে। তাঁর মেধার আলোয় এলাকা জ্বলে উঠেছিল। আমরা এই নৃশংস হত্যার বিচার চাই।’
নিহতের চাচা দানিয়াল আকন শোকাতুর কণ্ঠে বলেন, ‘ও বাড়িতে আসলে সবাইকে পড়ার উপদেশ দিত, ভালো মানুষ হওয়ার কথা বলত। আজ থেকে আর কেউ সেই উপদেশ দেবে না। আমরা শুধু আমাদের মেয়েকে হারাইনি, হারিয়েছি পুরো এলাকার একটি সম্পদ।’
স্থানীয় বাসিন্দা রোমান সরদার এই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, ‘বৃষ্টি আমাদের এলাকার গর্ব। তাঁর এই মৃত্যু আমরা মেনে নিতে পারছি না। আমরা খুনি হিশাম আবুঘরবেহর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই এবং সরকার যেন এই অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়ায়।’
উল্লেখ্য, গত ১৬ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় (ইউএসএফ) পিএইচডি গবেষণারত দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি নিখোঁজ হন। পরদিন তাঁদের এক বন্ধু বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও পুলিশকে জানালে অনুসন্ধানে নামে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পরবর্তীতে পুলিশ নিশ্চিত করে, দুজনেই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এই ঘটনায় লিমনের রুমমেট মার্কিন নাগরিক হিশাম আবুঘরবেহকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর আগে গত ৪ মে এই ঘটনায় নিহত অপর শিক্ষার্থী লিমনের মরদেহ দেশে পৌঁছায়।
বৃষ্টির অকাল বিদায় আর যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর মেধা বিকাশের স্বপ্ন থমকে যাওয়ায় মাদারীপুর জুড়ে বিরাজ করছে চাপা ক্ষোভ ও গভীর শোক। এখন কেবল নিথর দেহটি আসার অপেক্ষা, এরপর জানাজা শেষে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হবে এই মেধাবীকে।
