ঢাকা বুধবার, ২০শে মে ২০২৬, ৭ই জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩


বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বড় প্রস্তাব: বিপাকে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত, বিইআরসির শুনানিতে মিলবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত


প্রকাশিত:
২০ মে ২০২৬ ১৫:৫৯

বিদ্যুৎ খাতের ক্রমবর্ধমান লোকসান ও ভর্তুকির লাগাম টানতে পাইকারি ও খুচরা—উভয় পর্যায়েই বিদ্যুতের দাম বড় ধরনের বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ও দেশের ছয়টি বিতরণ কোম্পানি। এই প্রস্তাব কার্যকর হলে দেশের প্রায় ৫ কোটি গ্রাহকের জীবনযাত্রার ব্যয়ে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে, যার ফলে বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা চরম আর্থিক চাপের মুখে পড়বেন।

বিপিডিবির প্রস্তাব অনুযায়ী, আবাসিক গ্রাহকদের ইউনিটপ্রতি বিদ্যুতের গড় দাম ৭ টাকা ২০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৮ টাকা ৬৫ পয়সা করার সুপারিশ করা হয়েছে। সংস্থাটি তাদের নতুন পরিকল্পনায় ০ থেকে ২০০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারীদের একই স্ল্যাবের আওতায় আনার প্রস্তাব দিয়েছে। এতে মাসে মাত্র ৫০ ইউনিট ব্যবহার করা প্রান্তিক গ্রাহকের মাসিক বিদ্যুৎ খরচও প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি পৌঁছে যেতে পারে।

পাশাপাশি উচ্চমাত্রার বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের জন্য বিল বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে ২৩.৯৫ শতাংশ পর্যন্ত। শুধুমাত্র আবাসিকেই নয়, সেচ পাম্প, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, শিল্পকারখানা ও বাণিজ্যিক ভবনের বিদ্যুতের দামও ১৫ থেকে ২৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

বিপিডিবি জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পণ্যের উচ্চমূল্য, ডলারের অবমূল্যায়ন, ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা এবং উৎপাদন খরচের তুলনায় বিক্রয়মূল্যের অসামঞ্জস্যতা এই পরিস্থিতির মূল কারণ। সংস্থাটির হিসাবে, চলতি অর্থবছরে তাদের লোকসানের পরিমাণ ৬০ হাজার ১২৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা। পাইকারি মূল্য বাড়ানো না হলে আগামী অর্থবছরে এই লোকসান প্রায় ৬৩ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। লোকসান মেটাতে পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১২ টাকা ৯১ পয়সা করার প্রস্তাব দিয়েছে পিডিবি।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোও নিজ নিজ এলাকায় দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে:
পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি): ৫০ ইউনিটের নিচে ব্যবহারকারীদের বিল অপরিবর্তিত রাখার প্রস্তাব দিলেও, এর বেশি ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধির পরিকল্পনা করেছে।

ডেসকো: লোকসান কমাতে খুচরা পর্যায়ে ৯.৬৭ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির আবেদন করেছে।
ডিপিডিসি: খুচরা পর্যায়ে ৬.৯৬ শতাংশ দাম বাড়ানোর পাশাপাশি প্রিপেইড মিটারে সিকিউরিটি চার্জ যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে।
নেসকো ও ওজোপাডিকো: নিজ নিজ এলাকায় পরিচালন ব্যয় ও আর্থিক ঘাটতি মেটাতে যথাক্রমে বড় অংকের বিলিং রেট বৃদ্ধি ও ১০ শতাংশ দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে।

বিদ্যুতের এই মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব নিয়ে আগামী ২০ ও ২১ মে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) গণশুনানি অনুষ্ঠিত হবে। গ্রাহকদের ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি মাথায় রেখে বিইআরসি সদস্য (বিদ্যুৎ) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ শাহিদ সারওয়ার বলেন, “বিতরণ কোম্পানিগুলোর প্রস্তাবনা নিয়ে আমরা কাজ করছি। গণশুনানিতে প্রাপ্ত মতামত ও ফলাফলের ওপর ভিত্তি করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। কমিশন সবসময় জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয় এবং গ্রাহকদের ওপর বাড়তি চাপ যাতে না পড়ে, সেটি নিশ্চিত করার চেষ্টা করবে।”

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই সময়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর এই উদ্যোগ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বাড়তি দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন দেখার বিষয়, বিইআরসির চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে সাধারণ গ্রাহকদের জন্য কোনো সুখবর থাকে কি না।