মাদকের ভয়াল থাবায় বিপন্ন সমাজ: বাড়ছে শিশু ধর্ষণ ও নৃশংস অপরাধ
দেশে মাদকের বিস্তার ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। আর এই মাদকের নেশায় মত্ত হয়ে এক শ্রেণির মানুষ জড়িয়ে পড়ছে শিশু ধর্ষণ, হত্যাসহ নানা নৃশংস অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, মাদকের এই করাল গ্রাস যুবসমাজকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তার জন্য এক বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় তুলেছে। এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন সংগঠন বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে। সমাবেশে রামিসার হত্যাকারী সোহেল রানার দ্রুত বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি, এ ধরনের জঘন্য অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধে রাষ্ট্রের কঠোর অবস্থান প্রত্যাশা করছেন ভুক্তভোগী পরিবার ও সচেতন মহল।
মাদক ও অপরাধের ভয়াবহ সম্পর্ক
মানবাধিকার সংগঠনের তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই ১১৮ জন কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং ১৭ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক এ প্রসঙ্গে বলেন, “শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মতো জঘন্য অপরাধ প্রতিরোধে দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। একইসঙ্গে সমাজে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের চর্চা বাড়াতে হবে।”
মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মতো বিকৃত মানসিকতার অপরাধের নেপথ্যে বড় ভূমিকা রাখছে মাদক। তারা বলছেন, দীর্ঘদিন মাদক সেবনের ফলে মানুষের বিবেক ও আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা পুরোপুরি লোপ পায়, যার ফলে মাদকাসক্তরা দানবীয় আচরণ করতে শুরু করে।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. ফারজানা রহমান বলেন, “মাদক মস্তিষ্কের কোষ ধ্বংস করে আগ্রাসী আচরণ ও মানসিক ভারসাম্যহীনতা তৈরি করে। এটি ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের জন্য এক মারাত্মক বিষফোঁড়া।”
মাদকের সহজলভ্যতা ও উদ্বেগজনক বিস্তার
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ মাদকাসক্ত। এর মধ্যে গাঁজা, ইয়াবা ও অ্যালকোহলের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। গবেষণায় দেখা গেছে, মাদকাসক্তদের মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ৮ থেকে ১৭ বছর বয়সের মধ্যে নেশায় জড়িয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন ও কোকেনের চোরাচালান অব্যাহত থাকায় শহর থেকে গ্রামেও মাদকের বিস্তার ঘটছে। নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ডার্ক ওয়েব ও ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অনলাইনে মাদক কেনাবেচা, যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রয়োজন সমন্বিত পদক্ষেপ
চিকিৎসক ও বিশ্লেষকগণ একমত যে, মাদক সমস্যা কেবল আইনি বিষয় নয়, এটি একটি বহুমাত্রিক জনস্বাস্থ্য সংকট। এই সংকট মোকাবিলায় আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবারকে সচেতন হতে হবে। এছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সেবার পরিধি বাড়ানো এবং সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন তারা।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলছেন, পরিবার, প্রশাসন ও রাষ্ট্রের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া মাদকের এই ভয়াল থাবা থেকে সমাজকে রক্ষা করা অসম্ভব। অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে শিশু ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের মতো নৃশংস অপরাধের মিছিল দীর্ঘতর হবে, যার চড়া মূল্য দিতে হবে গোটা সমাজকে।
