উন্নত জীবনের স্বপ্নে সাগরে মৃত্যুমিছিল: পাঁচ মাসে প্রাণ হারালেন ১৩০০ অভিবাসনপ্রত্যাশী
উন্নত জীবনের আশায় বুক বেঁধে ইউরোপে পাড়ি জমানোর চেষ্টা ফের ভয়াবহ ট্র্যাজেডিতে রূপ নিয়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসেই স্পেন উপকূলে পৌঁছানোর চেষ্টাকালে প্রাণ হারিয়েছেন ১ হাজার ৩০০-এর বেশি অভিবাসনপ্রত্যাশী। ভয়াবহ এই পথটি এখন অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জন্য এক মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে।
বুধবার (১০ জুন) আফ্রিকা থেকে ইউরোপে যাওয়ার বিপজ্জনক রুটগুলো নজরদারি করা মানবাধিকার সংস্থা 'কামিনান্দো ফ্রোন্তেরাস' এক প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করেছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বছরের প্রথম পাঁচ মাসে স্পেনের উপকূলে পৌঁছানোর চেষ্টায় ১ হাজার ৩১৭ জন মানুষ সাগরে প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে এক হৃদয়বিদারক তথ্য হলো—মৃতদের মধ্যে ১৪২ জন নারী এবং ১২৯ জন শিশু রয়েছে। এছাড়া সাগরের উত্তাল ঢেউয়ে ২৭টি নৌকা আরোহীসহ নিখোঁজ হয়ে গেছে, যাদের ভাগ্যে কী ঘটেছে তা আজও অজানা।
মানবাধিকার সংস্থাটি জানায়, আটলান্টিক মহাসাগর ও পশ্চিম ভূমধ্যসাগরের এই রুটটি গত এক দশকে অনিয়মিত অভিবাসনের জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষ করে স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছানোর প্রবণতা ব্যাপকভাবে বেড়েছে।
সাগরে এই বিপুল সংখ্যক মানুষের মৃত্যুর ঘটনা এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন ক্যাথলিক ধর্মগুরু পোপ লিও স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জ সফরে যাচ্ছেন। সফরকালে তিনি অভিবাসনপ্রত্যাশীদের প্রতি ইউরোপীয় দেশগুলোর আচরণ নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেন। পোপ বলেন, "অভিবাসনপ্রত্যাশীদের এই দুর্দশা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তিকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। এটি কোনো সাধারণ সমস্যা নয়, বরং একটি মানবিক সংকট।"
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, মরক্কো ও মৌরিতানিয়ার মতো দেশগুলোতে পারাপার বন্ধে কড়াকড়ি ও নজরদারি বৃদ্ধি করায় অভিবাসনপ্রত্যাশীরা এখন আরও বিপজ্জনক পথ বেছে নিচ্ছেন। কোস্ট গার্ডের চোখ এড়াতে তারা আটলান্টিক মহাসাগরের দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ পথ দিয়ে ছোট নৌকায় করে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করছেন। মূলত এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়েই ছোট নৌকাগুলো দুর্ঘটনার কবলে পড়ছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালেও এই একই পথে ৩ হাজার ৯০ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী প্রাণ হারিয়েছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন। ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জ থেকে আফ্রিকা উপকূলের সর্বনিম্ন দূরত্ব প্রায় ১০০ কিলোমিটার হলেও অনেক অভিবাসনপ্রত্যাশী মরক্কো থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটারের সরু পথটি সাঁতরে পার হওয়ার মতো আত্মঘাতী সিদ্ধান্তও নিচ্ছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দারিদ্র্য ও সংঘাত থেকে বাঁচতে মরিয়া এই মানুষগুলোর জন্য নিরাপদ ও আইনি পথ সুগম না করলে সাগরে এই মৃত্যুমিছিল থামানো সম্ভব হবে না।
সূত্র: রয়টার্স।
