স্বাক্ষর জালিয়াতি মামলা: মমতার বাসভবনে সিআইডির ম্যারাথন তল্লাশি, তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নজিরবিহীন মোড়। বিধায়কদের স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগ ঘিরে চলমান বিতর্কের জল এবার গড়াল খোদ মুখ্যমন্ত্রীর অন্দরমহলে। মঙ্গলবার দুপুরে আদালতের তল্লাশি পরোয়ানা নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বোচ্চ নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাটের বাসভবন ও দলীয় কার্যালয়ে হানা দিয়েছে রাজ্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। একই সঙ্গে তল্লাশি চালানো হচ্ছে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবন ও কার্যালয়েও।
মঙ্গলবার দুপুরে সিআইডির একটি বিশাল দল, কালীঘাট থানার পুলিশ এবং বিপুল সংখ্যক নারী পুলিশ সদস্যকে সঙ্গে নিয়ে ৩০বি হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটে উপস্থিত হন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, সিআইডির আধিকারিকরা তিনটি পৃথক দলে বিভক্ত হয়ে এই অভিযান পরিচালনা করছেন। একটি দল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবনে, দ্বিতীয় দল অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কার্যালয়ে এবং তৃতীয় দলটি অভিষেকের ব্যক্তিগত বাসভবনে তল্লাশি চালাচ্ছে।
ঘটনার সূত্রপাত বিধানসভার বিরোধী দলনেতা হিসেবে জ্যেষ্ঠ তৃণমূল বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে স্বীকৃতি দেওয়ার একটি প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে। উক্ত প্রস্তাবটি বিধানসভার স্পিকারের কাছে জমা দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগ ওঠে, ওই প্রস্তাবে একাধিক তৃণমূল বিধায়কের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে।
সিআইডি সূত্রে খবর, কয়েকদিন আগে এই বিষয়ে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নোটিশ পাঠানো হয়েছিল। জবাবে অভিষেক জানিয়েছিলেন, বিধায়কদের স্বাক্ষরগুলো দলীয় কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকেই সংগ্রহ করা হয়েছিল। তাঁর সেই বয়ানকে ভিত্তি করেই তথ্যের সত্যতা যাচাই ও প্রমাণের খোঁজে আজ এই তল্লাশি অভিযান চালানো হচ্ছে।
তৃণমূলের তৎকালীন দুই বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সন্দীপন সাহা প্রথম এই জালিয়াতির অভিযোগ তোলেন। স্পিকারের কাছে লিখিত অভিযোগে তাঁরা দাবি করেন, ৭০টি স্বাক্ষরের মধ্যে অন্তত ১৪টি স্বাক্ষর ব্লক লেটারে লেখা ছিল, যা স্পষ্টত জালিয়াতির ইঙ্গিত দেয়। তাঁদের দাবি ছিল, এই প্রস্তাবটি সম্পূর্ণ ‘মনগড়া ও জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি’।
উল্লেখ্য, এই গুরুতর অভিযোগ তোলার পরপরই ঋতব্রত ও সন্দীপনকে ‘দলবিরোধী কর্মকাণ্ডের’ অভিযোগে তৃণমূল কংগ্রেস থেকে বহিষ্কার করা হয়। বর্তমানে এই পুরো বিষয়টি নিয়ে একটি এফআইআর দায়ের করা হয়েছে, যার ভিত্তিতেই তদন্ত প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সিআইডি।
রাজ্যের ইতিহাসে এমন ঘটনা বিরল বলে মনে করছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ। শাসকদলের শীর্ষ নেতৃত্বের বাসভবনে সিআইডির এই তৎপরতা নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। বিরোধীরা একে ‘সত্য উদঘাটনের পথে বড় পদক্ষেপ’ হিসেবে দেখলেও, তৃণমূল শিবিরের পক্ষ থেকে এখনও এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
তদন্তকারী সংস্থার এই অভিযানের ফলে স্বাক্ষর জালিয়াতি মামলায় নতুন কোনো তথ্য বা নথিপত্র উঠে আসে কি না, এখন সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে গোটা রাজ্য।
