৩০০ গরিবের উন্নয়নে ৫০০ পরামর্শক! ৬১ কোটির প্রকল্পে গরিবের ভাগে স্রেফ ১৩ শতাংশ!
৩০০ জন জলবায়ু উদ্বাস্তু ও দরিদ্র মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য ৬১ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে সমাজসেবা অধিদপ্তর। তবে এই প্রকল্পের খরচের খাত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে এক অদ্ভুত চিত্র। ৩০০ জন মানুষকে সেবা দিতে পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে ৪৭৩ জন। অর্থাৎ উপকারভোগীর চেয়ে পরামর্শকের সংখ্যাই বেশি। আর এই পরামর্শকদের পকেটে যাবে প্রকল্পের বরাদ্দের অর্ধেক বা ৩০ কোটি টাকা।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জিআইজেড-এর (GIZ) অর্থায়নে ‘ইন্টিগ্রেট’ নামের এই প্রকল্পটি মূলত খুলনা, সাতক্ষীরা, রাজশাহী ও সিরাজগঞ্জ জেলার বাস্তুচ্যুত মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য নেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রকল্পের বিশাল অংকের টাকা ব্যয় করা হচ্ছে প্রশাসনিক ও বিলাসিতা খাতে। ৪৭৩ জন পরামর্শকের ফি বাবদ ৩০ কোটি টাকা ছাড়াও অফিস ভাড়া ও ব্যবস্থাপনা খাতে আরও ১৩ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে বিদেশ ভ্রমণের আবদার দেশের অর্থনৈতিক সংকট ও ডলার সাশ্রয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণে সরকারের কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে এই প্রকল্পে কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ ও প্রশিক্ষণের জন্য ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর বাইরে অভ্যন্তরীণ ভ্রমণের নাম করে আরও ১ কোটি ২৭ লাখ টাকা খরচ করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
৬১ কোটি টাকার এই প্রকল্পের সিংহভাগই খরচ হচ্ছে পরামর্শক, আমলাদের ভ্রমণ এবং অফিস ব্যবস্থাপনায়। সব ব্যয় শেষে মূল উপকারভোগী ৩০০ জন গরিব মানুষের ভাগ্যে জুটবে মাত্র ৮ কোটি ১০ লাখ টাকা। শতাংশের হিসেবে যা মোট বরাদ্দের মাত্র ১৩ শতাংশ। অর্থাৎ জনগণের বা অনুদানের ৮৭ শতাংশ টাকাই খরচ হয়ে যাবে গরিবের কাছে পৌঁছানোর আগেই।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন প্রকল্পের এমন অসংগতিপূর্ণ ব্যয়কে ‘নৈতিকতার চরম স্খলন’ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সাবেক পরিকল্পনা সচিব মামুন আল রশীদ বলেন, "এই ধরনের প্রকল্প থেকে আমাদের নিষ্কৃতি পাওয়া উচিত। ১০ টাকার মধ্যে যদি গরিব মানুষ মাত্র ৩ টাকা পায়, তবে এমন অনুদানের প্রয়োজন নেই। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং পরিকল্পনা কমিশনের উচিত এই ব্যয়গুলো গভীরভাবে যাচাই করা।"
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ বলেন, "প্রশাসনিক ব্যয় এবং ভ্রমণের মতো বিষয়গুলো যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা উচিত। গরিবের টাকা যেন আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় নষ্ট না হয়।"
সিদ্ধান্ত হবে ৫ জুলাই সমাজসেবা অধিদপ্তরের তৈরি করা এই প্রশ্নবিদ্ধ প্রকল্পটি বর্তমানে পরিকল্পনা কমিশনে চূড়ান্ত মূল্যায়নের অপেক্ষায় আছে। আগামী ৫ জুলাই প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় এই ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
