ঢাকা শনিবার, ২৯শে নভেম্বর ২০২৫, ১৬ই অগ্রহায়ণ ১৪৩২


ছারছিনা দরবার শরীফে ১৩৫তম ইছালে ছাওয়াব মাহফিল


প্রকাশিত:
২৯ নভেম্বর ২০২৫ ১৪:৩০

ধর্মীয় আবহে মুখরিত নেছারাবাদ, লাখো মানুষের পদচারণায় জমে উঠেছে আধ্যাত্মিক সমাবেশ। পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার শান্ত-নিরিবিলি গ্রাম ছারছিনা—বছরের অন্য সময়ের তুলনায় এখন যেন সম্পূর্ণ বদলে যাওয়া একটি চিত্র। গ্রামের সরু রাস্তা থেকে শুরু করে দরবার শরীফের প্রবেশপথ পর্যন্ত সর্বত্র মানুষের ঢল। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মুরিদান, ধর্মপ্রাণ মানুষ ও ভক্ত-অনুরাগীদের উপস্থিতিতে এলাকা পরিণত হয়েছে আধ্যাত্মিকতার এক বৃহৎ মিলনমেলায়। কারণ, শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী ১৩৫তম ইছালে ছাওয়াব মাহফিল ও জমইয়াতে হিযবুল্লাহ ইসলামি সভা।

অভিন্ন ঐতিহ্য, শত বছরের আয়োজন

ঐতিহ্যবাহী এ মাহফিল কেবল একটি ধর্মীয় সমাবেশ নয়; এটি দক্ষিণাঞ্চলের মুসলমানদের আধ্যাত্মিক চর্চা ও মিলনের অন্যতম প্রাচীন গণসমাবেশ। ছারছিনা দরবার শরীফ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পীর সাহেবদের ধারাবাহিক নেতৃত্বে এ মাহফিল হয়ে আসছে নিয়মিতভাবে। এক সময় নদীপথে নৌকা-লঞ্চে ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো; এখন সড়কপথের উন্নতি হওয়ায় দেশের নানা প্রান্ত থেকে সহজেই মানুষ ছুটে আসছেন এ মাহফিলে অংশ নিতে।

উদ্বোধনী বয়ানের মধ্য দিয়ে শুরু

শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) বিকেলে হযরত পীর সাহেবের জিকির তালিম ও উদ্বোধনী বয়ানের মাধ্যমে মাহফিলের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। উদ্বোধনের সঙ্গে সঙ্গেই জিকির-আসকার, দোয়া, কুরআন তেলাওয়াতের ধ্বনি ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। সন্ধ্যার পর দরবার শরীফের আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে অঙ্গন, আর শুরু হয় হাজারো মানুষের জমায়েত।

ভোর থেকে রাত—জাগ্রত থাকে পুরো এলাকা

প্রতিদিন ভোরের ফজরের আজানের আগেই ভক্তদের সারি লেগে যায় ওয়াজ-মাহফিলের স্থানে। কোরআন-হাদিসভিত্তিক আলোচনা, ইসলামী তাসাউফ, শিষ্টাচার, আধ্যাত্মিক চর্চা—সবকিছু মিলিয়ে প্রতিদিনই চলে বয়ানের ধারাবাহিকতা। বিভিন্ন এলাকার আলেম-ওলামারা ধর্মীয় বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ নসিহত তুলে ধরেন। জিকির-কিয়াম, মুনাজাত ও আধ্যাত্মিক চর্চায় অংশ নিয়ে স্বস্তি ও প্রশান্তি খুঁজে পান আগত মুসল্লিরা।

প্রস্তুতিতে ছিল বিশেষ গুরুত্ব

এই বিশাল আয়োজনকে ঘিরে কয়েকদিন ধরেই ব্যস্ত সময় পার করেছেন দরবার কর্তৃপক্ষ ও হাজারো স্বেচ্ছাসেবী। নিরাপত্তা ব্যবস্থা, শৃঙ্খলা বজায় রাখা, নামাজের জায়গা, পানি ও খাবারের ব্যবস্থা, টয়লেট সুবিধা, চিকিৎসা কেন্দ্র—সবকিছুতে ছিল বিশেষ নজর। পাশাপাশি আলোকসজ্জা, প্যান্ডেল, সাউন্ড সিস্টেম, মঞ্চ নির্মাণ—সব মিলিয়ে পুরো দরবার এলাকায় তৈরি হয়েছে এক উৎসবমুখর পরিবেশ।

নিরাপত্তা ও স্বেচ্ছাসেবক টিমের তৎপরতা

মাহফিলে লাখো মানুষের সমাগম হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, রিজার্ভ পুলিশ, ট্রাফিক টিম, ফায়ার সার্ভিস ও দরবারের নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক দল নিরলসভাবে কাজ করছে। পার্কিং ব্যবস্থায় চালকদের সহায়তা করছে আলাদা টিম। নারী মুসল্লিদের জন্য রয়েছে আলাদা প্রবেশপথ ও আলাদা জায়গায় নিরাপদ পরিবেশ।

মাহফিলের মূল আকর্ষণ—১ ডিসেম্বর আখেরী মোনাজাত

আগামী ১ ডিসেম্বর (সোমবার) জোহর নামাজের পর অনুষ্ঠিত হবে আখেরি মোনাজাত। শেষ দিনের এই বিশেষ দোয়ায় লাখো মুসল্লির অংশগ্রহণ প্রত্যাশা করা হচ্ছে। বিশেষ মোনাজাতে দেশ-জাতির শান্তি, উন্নতি, মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, দুনিয়া-আখেরাতের কল্যাণ এবং মানবতার শান্তি কামনা করা হবে।

ধর্মীয় উষ্ণতায় মুখরিত ছারছিনা

মাহফিলকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়েছে এক অনন্য ধর্মীয় আবহ। স্থানীয় দোকানপাট, যোগাযোগ ব্যবস্থা, আশপাশের গ্রাম—সব জায়গায় চলছে মানুষের ঢল। কেউ আসছেন ভক্তি নিয়ে, কেউ দেখতে এসেছে ঐতিহ্য, কেউ বা শুধু অংশ নিতে চায় বিশাল আধ্যাত্মিক সমাবেশে।
সন্ধ্যার পর দরবার প্রাঙ্গণের আলোকসজ্জা, দোয়ার মুনাজাতে কণ্ঠ মিলানো মানুষের স্বর, এবং হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে ছারছিনা যেন পরিণত হয়েছে শান্তি ও প্রশান্তির কেন্দ্রস্থলে।