তীব্র তারল্য সংকট ও গ্রাহকদের গণ-উত্তোলন: ১০ হাজার কোটি টাকার জরুরি তহবিল চাইল ইসলামী ব্যাংক
দেশের বৃহত্তম বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে আবারও গভীর অস্থিরতা ও তীব্র তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে। ব্যাংকটির শীর্ষ নেতৃত্বে আকস্মিক পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে চরম আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে মাত্র সাত কার্যদিবসেই ব্যাংকটি থেকে প্রায় ৪ হাজার ২৪০ কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন আতঙ্কিত গ্রাহকরা। উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকার জরুরি বিশেষ তারল্য সহায়তা চেয়েছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
ব্যাংকিং সূত্র জানায়, গত ২৪ মে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম জুবায়দুর রহমান আকস্মিক পদত্যাগ করেন। একই দিনে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই নিয়োগের পর থেকেই ব্যাংকটির কর্মকর্তা-কর্মচারী ও গ্রাহকদের একটি বড় অংশের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়। ‘ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে মতিঝিলে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে টানা বিক্ষোভ চলছে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, বিতর্কিত ব্যক্তিকে শীর্ষ পদে বসানোর ফলে ব্যাংকের সংস্কার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হবে।
টানা গণ-উত্তোলনের ফলে ব্যাংকটির আর্থিক ভিত্তি ও তারল্য ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ধস নেমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী ব্যাংকটির ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও (সিআরআর) যেখানে ৭ হাজার কোটি টাকা থাকার কথা, সেখানে তা বর্তমানে নেমে এসেছে মাত্র ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকায়। সিআরআর-এর এই ভয়াবহ ঘাটতির পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে থাকা ব্যাংকটির দৈনিক চলতি হিসাবের (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট) ব্যালেন্সও নেগেটিভ বা ঘাটতির দিকে এগোচ্ছে। ফলে দৈনন্দিন লেনদেন ও গ্রাহকদের টাকা পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। এই সংকট থেকে বাঁচতেই ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিলের আবেদন করা হয়েছে।
ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, ৪-৫ হাজার কোটি টাকা উত্তোলন ইসলামী ব্যাংকের মতো বিশাল ব্যাংকের জন্য তাৎক্ষণিক অস্তিত্বের সংকট না হলেও, আস্থাহীনতার বার্তাটি বিপজ্জনক। যদি এই প্রবণতা আরও কয়েক সপ্তাহ চলে এবং উত্তোলনের পরিমাণ ১০ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়, তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে বড় ধরনের নীতিগত হস্তক্ষেপ বা পর্ষদ পরিবর্তন ছাড়া বিকল্প থাকবে না।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংক অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। তিনি বলেন, “ইসলামী ব্যাংক বর্তমানে এমন কোনো দেউলিয়া অবস্থায় নেই যে গ্রাহকদের টাকা দিতে পারবে না। গ্রাহকরা আতঙ্কিত হয়ে টাকা তুলে নিচ্ছেন নাকি অন্য ব্যাংকে সরাচ্ছেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজনীয় তারল্য সহায়তা দেবে।”
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন খবরে কান না দিতে গ্রাহকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ম্যানেজিং ডিরেক্টর (এমডি) মুহাম্মদ আলতাফ হোসেন। এক ভিডিও বার্তায় তিনি দাবি করেন, “ইসলামী ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি অত্যন্ত মজবুত এবং কোনো তারল্য সংকট নেই। গ্রাহকদের স্বার্থ সুরক্ষায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক সবসময় আমাদের পাশে আছে।”
তবে সাধারণ গ্রাহক ও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, কেবল ধার করা তহবিল দিয়ে দেশের বৃহত্তম এই শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের সংকট স্থায়ীভাবে দূর করা সম্ভব নয়; বরং দ্রুত গ্রাহকদের আস্থা ফেরানোর মতো কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য পদক্ষেপ নিতে হবে।
