ঢাকা শনিবার, ৯ই মে ২০২৬, ২৭শে বৈশাখ ১৪৩৩


দেশে হামের ভয়াবহ মরণকামড়: আরও ৭ শিশুর মৃত্যু, মোট প্রাণহানি ৩৪৩


প্রকাশিত:
৯ মে ২০২৬ ১৩:১৫

দেশে হামের প্রাদুর্ভাব এখন এক ভয়াবহ মহামারিতে রূপ নিয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও এর উপসর্গে দেশে আরও সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলমান প্রাদুর্ভাবে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৪৩ জনে। বিশেষ করে ঢাকা ও সিলেট বিভাগে সংক্রমণের হার ও মৃত্যু উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত যে সাতজন মারা গেছে, তাদের মধ্যে ছয়জন হামের উপসর্গে এবং একজন সরাসরি হামে আক্রান্ত ছিল। মৃতদের মধ্যে তিনজন সিলেট বিভাগের, দুজন ঢাকার এবং একজন করে খুলনা ও বরিশাল বিভাগের বাসিন্দা।

অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ৫৪ দিনে দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে ২৮৫ জন এবং হামের উপসর্গে আরও ৫৮ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ২৮২ জন শিশুর হামে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে, যার সিংহভাগই (২০৪ জন) ঢাকা বিভাগের। এছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগে ৪৬ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে। বর্তমানে সারা দেশে ১ হাজার ২১২ জন সন্দেহজনক হামের রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। গত এক দিনে ৯৫০ জন শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৯১৪ জন।

হামের সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় দেশের হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংকট দেখা দিয়েছে। রোগীর প্রচণ্ড চাপে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা। এমন পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য ডেঙ্গু মৌসুমের চ্যালেঞ্জ ও বর্তমান হাম পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় ফিল্ড হাসপাতাল প্রস্তুত করার কাজ শুরু হয়েছে।

হামের জটিলতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় শিশু বিশেষজ্ঞরা। অধ্যাপক ডা. আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, "হাম সাধারণত ভাইরাসজনিত এবং ৭-১০ দিনে সেরে যায়। তবে শ্বাসকষ্ট, বুক দেবে যাওয়া, খিঁচুনি, বারবার বমি বা তীব্র পানিশূন্যতা দেখা দিলে মুহূর্ত দেরি না করে শিশুকে হাসপাতালে নিতে হবে।"

ঢাকা শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মাহবুবুল হক জানান, জ্বর ও র‌্যাশ ওঠার পর যদি নিউমোনিয়ার লক্ষণ দেখা দেয়, তবে তা প্রাণঘাতী হতে পারে। এক্ষেত্রে অভিভাবকদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।

হামের এই ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য টিকা ব্যবস্থাপনার ত্রুটিকে দায়ী করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দেশের টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। এর ফলে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, তারই মাসুল দিচ্ছে বর্তমানের শিশুরা। অপুষ্টি এবং দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা এই মৃত্যুহার বৃদ্ধিতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।

সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদান কর্মসূচির ধারাবাহিকতা সামান্য ব্যাহত হলেও রোগের পুনরুত্থান ঘটতে পারে, যা বর্তমানে বাংলাদেশে দৃশ্যমান। তবে টিকা সরবরাহে ঘাটতির অভিযোগ নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

অকাল মৃত্যু ঠেকাতে দ্রুত টিকাদান নিশ্চিত করা এবং আক্রান্ত শিশুদের সঠিক পুষ্টি ও চিকিৎসা সেবা প্রদানের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।